স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস (৭ম-সংক্ষিপ্ত)

স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস (৭ম-সংক্ষিপ্ত) প্রশ্নোত্তর ও সাজেশন সম্পর্কে আজকে বিস্তারিত সকল কিছু জানতে পারবেন। সুতরাং সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি মনোযোগ দিয়ে পড়ুন। অনার্স ১ম বর্ষের যেকোন বিভাগের সাজেশন পেতে জাগোরিকের সাথে থাকুন।

অনার্স প্রথম পর্ব
বিভাগ: স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস
বিষয় : ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান ও ১১ দফা আন্দোলন
বিষয় কোড: ২১১৫০১

খ-বিভাগঃ সংক্ষিপ্ত প্রশ্নের উত্তর

০১. ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান সম্পর্কে সংক্ষেপে লেখ ।
অথবা, ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানের সংক্ষিপ্ত বিবরণ দাও ।

উত্তর: ভূমিকা : জেনারেল আইয়ুব খানের এক দশকের মৌলিক গণতন্ত্রের অভিশাপে উত্তপ্ত পূর্ব পাকিস্তানের সংক্ষুব্ধ জনগণের ১৯৬৯ সালের তীব্র আন্দোলনই গণঅভ্যুত্থান নামে পরিচিত।

পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধিকার আন্দোলনের ইতিহাসে ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান এক অনন্য সংযোজন।মূলত এ গণঅভ্যুত্থান ছিল পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বৈষম্যমূলক আচরণের তীব্র প্রতিবাদ ।

৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান : ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান বাঙালি জাতির ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা করে।

ছাত্র সমাজের ১১ দফা এবং আওয়ামী লীগের ৬ দফার সমন্বয়ে শিক্ষার সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধি, সংসদীয় গণতন্ত্র প্রবর্তন, জরুরি আইন প্রত্যাহার প্রভৃতি দাবিতে ছাত্র-জনতার আন্দোলন শুরু হয় কিন্তু তৎকালীন পাকিস্তান সরকার ছাত্রসমাজের ১১ দফা এবং জনতার ৬ দফা দাবিকে রাষ্ট্রবিরোধী বলে ঘোষণা করে এবং আগরতলা ষড়যন্ত্রমূলক মামলা সাজিয়ে শেখ মুজিবকে আটক করে।

স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস (৭ম-সংক্ষিপ্ত) *

এর ফলে সমগ্র বাংলাদেশে ছাত্র-জনতা আন্দোলনের রুদ্ররোষে ফেটে পড়ে এবং এ আন্দোলন ধীরে ধীরে গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। সরকার এ আন্দোলনকে নস্যাৎ করার জন্য সমগ্র বাংলায় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে ১৪৪ ধারা জারি করে।

কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানে ছাত্র-জনতা ১৪৪ ধারা ভেঙে রাস্তায় নেমে পড়লে শুরু হয় প্রচণ্ড আন্দোলন ও বিক্ষোভ মিছিল। এ সময়ে সরকারি নির্দেশে মিছিলের ওপর গুলি চালালে নিহত হয় ছাত্রনেতা আসাদসহ অনেক সাধারণ মানুষ।

ফলে পাকিস্তানের ৮টি রাজনৈতিক দল মৌলিক অধিকার আদায়ের শপথ নিয়ে ৮ দফা কর্মসূচির ভিত্তিতে গণতান্ত্রিক সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে। একপর্যায়ে প্রচণ্ড আন্দোলনের ফলে আইয়ুব খান আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য হয় ।

পরবর্তীতে রাজনৈতিক সংকট নিরসনের লক্ষ্যে আইয়ুব খান এক গোলটেবিল বৈঠক আহ্বান করে । শেখ মুজিব বৈঠকে যোগ দেন কিন্তু পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের দাবি না মানায় তিনি এ বৈঠক বর্জন করেন। ফলে পুনরায় শুরু হয় তীব্র গণআন্দোলন ।

স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস (৭ম-সংক্ষিপ্ত) *

প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান দেশের সার্বিক পরিস্থিতির ক্রমাবনতি রোধে ব্যর্থ হয়ে ১৯৬৯ সালের ২৫ মার্চ সব ক্ষমতা প্রধান সেনাপতি ইয়াহিয়া খানের হাতে অর্পণ করে পদত্যাগ করেন ।

উপসংহার : পরিশেষে বলা যায় যে, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের ফলে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক শোষণ ও বঞ্চনা থেকে মুক্তির পথ রচিত হয়। এর মধ্যে দিয়ে আইয়ুব খানের ক্ষমতার ভিত কেঁপে ওঠে।

আন্দোলনের তীব্রতায় অবশেষে পাকিস্তানের লৌহমানব খ্যাত আইয়ুব খানের পতন ঘটে।

 

০২. ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের কারণ আলোচনা কর ।
অথবা, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের পটভূমি সংক্ষেপে আলোচনা কর।

উত্তরঃ ভূমিকা : ১৯৬৮ সালের নভেম্বর-ডিসেম্বর থেকে ১৯৬৯ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানে এক অভূতপূর্ব গণ জাগরণের সৃষ্টি হয়েছিল। এ গণআন্দোলন সৃষ্টির ক্ষেত্রে পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্রসমাজ উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছিল।

‘৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানে ছাত্রদের এগারো দফা দাবির ভূমিকা ছিল অসাধারণ । বস্তুতপক্ষে ৬ দফা দাবির সাথে এগার দফা দাবির সংমিশ্রণে গণঅভ্যুত্থান অপ্রতিরোধ্য শক্তিতে পরিণত হয়।

১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের কারণ : নিম্নে ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের কারণ আলোচনা করা হলো :

১. সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রেণির স্বার্থরক্ষা : পূর্ববাংলার মধ্যবিত্ত শ্রেণির স্বার্থকে সংরক্ষণ করার জন্য ৬ দফা কর্মসূচি রচিত হয়েছিল। কিন্তু এগারো দফা কর্মসূচির লক্ষ্য ছিল পূর্ববাংলার ছাত্রছাত্রীসহ কৃষক ও শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষা করা। মূলত দেশের সর্ববৃহৎ জনগোষ্ঠীর লক্ষ্যার্জনের জন্যই ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত হয় ।

স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস (৭ম-সংক্ষিপ্ত) *

২. স্বায়ত্তশাসনের দাবি : স্বায়ত্তশাসনের দাবি ছিল গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম কারণ। স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার আন্দোলন পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ অনেক পূর্ব থেকেই করে আসছিল ।

স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য তারা ব্িির ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে যদিও তারা উক্ত প্রতিষ্ঠা করতে আন্দোলনে স্বাধীন হয়েছিল কিন্তু স্বায়ত্তশাসন প্রতি পারেনি। আবার তারা পশ্চিম পাকিস্তানিদের শাসনের জাঁতাকলে পিষ্ট হতে থাকে।

পাকিস্তানিদের তেইশ বছরের শাসনামল ছিল কলঙ্কময় তাই স্বায়ত্তশাসনের তীব্র আকাঙ্ক্ষা বাঙালি জাতিকে আইয়ুব শাসনের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ করে এবং বাঙালি জাতির ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনই গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত করে।

৩. দমননীতি গ্রহণ : আইয়ুব সরকারের দমননীতি গ্রহণ ছিল ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানের উল্লেখযোগ্য কারণ।

সমগ্র পাকিস্তানের গণতন্ত্রমনা জনগণ যখন আইয়ুব শাসনের একনায়কসুলভ আচরণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদমুখর হয়ে ওঠে, সরকার তখন অসহিষ্ণু হয়ে নির্যাতন ও নিপীড়নের পন্থা অবলম্বন করে।

ফলে রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও সাধারণ জনগণ চূড়ান্ত আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে।

স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস (৭ম-সংক্ষিপ্ত) *

৪. জাতীয়তাবোধের পুনর্জাগরণ : পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের মাঝে ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যে জাতীয়তাবোধের জন্ম হয়েছিল। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে তার পুনর্জাগরণ ঘটে।

পূর্ব পাকিস্তানের সামাজিক, রাজনৈতিক জীবনে ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান এত বেশি প্রভাব ফেলে যার ফলে পরবর্তীতে তারা স্বাধীনতা সংগ্রামে অবতীর্ণ হয় এবং দীর্ঘ নয় মাস যুদ্ধ করে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় অর্জন করে।

৫. আজীবন ক্ষমতায় থাকার ষড়যন্ত্র : গণঅভ্যুত্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর আজীবন ক্ষমতায় টিকে থাকার ষড়যন্ত্র ১৯৫৪ সাল থেকে ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত কতিপয় ক্ষমতালিপ্সু রাজনৈতিক ব্যক্তি ক্ষমতায় থেকে স্বেচ্ছাচারিতা শুরু করলে তা স্বায়ত্তশাসনের আশায় ’৬৬ সালে প্রণীত ৬ দফা রাজনৈতিক কর্মসূচি এবং ‘৬৮-৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানের পথ সুপ্রশস্ত হয়।

এরই ধারাবাহিকতায় সব ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে বাংলার দামাল ছেলেরা ছিনিয়ে আনে স্বপ্নের স্বাধীনতা।

স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস (৭ম-সংক্ষিপ্ত) *

উপসংহার : পরিশেষে বলা যায় যে, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের ক্ষেত্র তৈরি করে এবং এতে ছাত্রদের এগারো দফা দাবি যথেষ্ট ভূমিকা রাখে।

এগারো দফা কর্মসূচি সমগ্র পূর্ববাংলায় ছাত্র-শ্রমিক-কৃষকের মধ্যে ঐক্য ও সংহতিবোধ গড়ে তুলতে সক্ষম হয়।

ফলে বাঙালি জাতীয়তাবোধ শক্তিশালী হয়ে ওঠে এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদ পুষ্ট চিন্তাচেতনাই আইয়ুব সরকারের পতন ঘটিয়ে অর্জন করে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ।

 

০৩. ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের রাজনৈতিক কারণ আলোচনা কর ।
অথবা, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের রাজনৈতিক কারণ সংক্ষেপে লেখ ।

উত্তরঃ ভূমিকা : পাকিস্তানের রাজনৈতিক ইতিহাসে ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান এক ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত হয়ে বাঙালিরা আবার আবদ্ধ হয় পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকচক্রের রাজনৈতিক শৃঙ্খলে।

পশ্চিম পাকিস্তানিদের শাসন শোষণের বিরুদ্ধে বাংলার জনগণ ফুসে ওঠে। ফলে পূর্ব পাকিস্তানের গণঅভ্যুত্থান ঘটে।

১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের রাজনৈতিক কারণ : ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের পিছনে রাজনৈতিক কারণও নিহিত ছিল । নিম্নে সেগুলো আলোচনা করা হলো :

১. লাহোর প্রস্তাব সংশোধন : বাংলার শেষ মুখ্যমন্ত্রী শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবে একাধিক রাষ্ট্র গঠন করার কথা বলেন।

কিন্তু পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী নিজেদের স্বার্থে পরবর্তীতে এ প্রস্তাব সংশোধন করে একটিমাত্র রাষ্ট্র গঠনের সিদ্ধান্ত নিলে বাংলার জনগণ এটা ভালোভাবে নেয়নি । ফলে কালক্রমে এ সংশোধনী শুভ ফল বয়ে আনেনি।

২. স্বায়ত্তশাসনের দাবি : স্বায়ত্তশাসনের দাবি ছিল গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম কারণ।

স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস (৭ম-সংক্ষিপ্ত) *

স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার আন্দোলন পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ অনেক পূর্ব থেকেই করে আসছিল স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য তারা ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে যদিও তারা উক্ত আন্দোলনে স্বাধীন হয়েছিল কিন্তু স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি।

আবার তারা পশ্চিম পাকিস্তানিদের শাসনের জাঁতাকলে পিষ্ট হতে থাকে । পাকিস্তানিদের তেইশ বছরের শাসনামল ছিল কলঙ্কময় । তাই স্বায়ত্তশাসনের তীব্র আকাঙ্ক্ষা বাঙালি জাতিকে আইয়ুব শাসনের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ করে এবং বাঙালি জাতির ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনই গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত করে।

৩. দমননীতি গ্রহণ : আইয়ুব সরকারের দমননীতি গ্রহণ ছিল ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানের উল্লেখযোগ্য কারণ।

সমগ্র পাকিস্তানের গণতন্ত্রমনা জনগণ যখন আইয়ুব শাসনের একনায়কসুলভ আচরণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদমুখর হয়ে ওঠে, সরকার তখন অসহিষ্ণু হয়ে নির্যাতন ও নিপীড়নের পন্থা অবলম্বন করে। ফলে রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও সাধারণ জনগণ চূড়ান্ত আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে।

৪. জাতীয়তাবোধের পুনর্জাগরণ : পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের মাঝে ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যে জাতীয়তাবোধের জন্ম হয়েছিল। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে তার পুনর্জাগরণ ঘটে।

পূর্ব পাকিস্তানের সামাজিক, রাজনৈতিক জীবনে ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান এত বেশি প্রভাব ফেলে যার ফলে পরবর্তীতে তারা স্বাধীনতা সংগ্রামে অবতীর্ণ হয় এবং দীর্ঘ নয় মাস যুদ্ধ করে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় অর্জন করে।

স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস (৭ম-সংক্ষিপ্ত) *

৫. আজীবন ক্ষমতায় থাকার ষড়যন্ত্র গণঅভ্যুত্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর আজীবন ক্ষমতায় টিকে থাকার ষড়যন্ত্র ১৯৫৪ সাল থেকে ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত কতিপয় ক্ষমতালিপ্সু রাজনৈতিক ব্যক্তি ক্ষমতায় থেকে স্বেচ্ছাচারিতা শুরু করলে তা স্বায়ত্তশাসনের আশায় ‘৬৬ সালে প্রণীত ৬ দফা রাজনৈতিক কর্মসূচি এবং ‘৬৮-৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানের পথ সুপ্রশস্ত হয়। এরই ধারাবাহিকতায় সব ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে বাংলার দামাল ছেলেরা ছিনিয়ে আনে স্বপ্নের স্বাধীনতা।

উপসংহারঃ পরিশেষে বলা যায় যে, পাকিস্তান রাষ্ট্রের সৃষ্টিলগ্ন থেকেই পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠী বিভিন্নভাবে পূর্ববাংলা তথা পূর্ব পাকিস্তানকে রাজনৈতিকভাবে শোষণ ও শাসন করতে থাকে। এ অবস্থা চলতে থাকলে ১৯৬৯ সালে গণঅভ্যুত্থানের ফলে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক শোষণ ও বঞ্ছনা থেকে বাঙালি জাতির মুক্তির পথ রচিত হয়।

 

০৪. ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যগুলো সংক্ষেপে লেখ ।
অথবা, ১৯৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যগুলো কী?

উত্তরঃ ভূমিকা : পাকিস্তানের ২৩ বছরের রাজনৈতিক ইতিহাসে ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান ছিল অন্যতম উল্লেখযোগ্য ঘটনা।

ছাত্রসমাজের ১১ দফা এবং আওয়ামী লীগের ৬ দফার ভিত্তিতে শিক্ষার সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধি, সংসদীয় গণতন্ত্র প্রবর্তন, জরুরি আইন প্রত্যাহার প্রভৃতির দাবিতে ছাত্র-জনতার আন্দোলন শুরু হয়।

কিন্তু তৎকালীন পাকিস্তান সরকার আগরতলা মামলা সাজিয়ে অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবকে গ্রেফতার করলে সমগ্র পূর্ববাংলার ছাত্র-জনতা আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং ধীরে ধীরে এ আন্দোলন গণঅভ্যুত্থানে পরিণত হয়।

৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যসমূহ : ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যসমূহ ছিল নিম্নরূপ :

১. স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠা : পাকিস্তান রাষ্ট্রের শুরু থেকেই বাঙালিরা স্বায়ত্তশাসন দাবি করে আসছিল । স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠা করা ছিল গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম প্রধান দাবি।

স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস (৭ম-সংক্ষিপ্ত) *

২. গণতন্ত্রের পূর্ণ বাস্তবায়ন : পূর্ববাংলার জনগণ বুঝতে পেরেছিল। পশ্চিম পাকিস্তানের শাসন ও শোষণ থেকে মুক্তির জন্য গণতন্ত্রের পূর্ণ বাস্তবায়নের কোনো বিকল্প নেই ।

৩. সামরিক বেসামরিক আমলাতন্ত্রের কর্তৃত্ব লোপ : পশ্চিম পাকিস্তানি আমলাতান্ত্রিক শোষণও ছিল সীমাহীন। তাই এ আন্দোলনে সব ধরনের আমলাতন্ত্রের কতৃত্ব লোপ করা ছিল অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য।

৪. সকল গণবিরোধী ও অশুভ শক্তির মূলোৎপাটন : পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী সকল দিক দিয়ে বাঙালিদেরকে শাসন ও শোষণ করতো। ফলে সকল গণবিরোধ ও অশুভ শক্তির মূলোৎপাটন ছিল এ আন্দোলনের প্রধান লক্ষ্য।

৫. বিরাজমান বৈষম্য দূরীকরণ : এ আন্দোলনের মাধ্যমে বাঙালিরা দুই অংশের মধ্যকার বৈষম্য কমিয়ে উভয় অঞ্চলে সম-অধিকারের দাবি করে।

৬. সকল মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার ও রাজবন্দিদের মুক্তি পাকিস্তান রাষ্ট্রের শুরু থেকেই পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী তাদের অপশাসনের বিরুদ্ধে কথা বললেই বিভিন্ন মামলা দিয়ে হয়রানি ও দমন করতো এসব ভিত্তিহীন মামলার প্রত্যাহার ছিল অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্যে।

উপসংহার : পরিশেষে বলা যায় যে, সংগ্রামী জনতার উত্তাল তরঙ্গের আঘাতে ক্ষমতাসীন সরকারের ভিত দুর্বল হয়ে পড়ে। ছাত্র-জনতা কারো কারো ঘরবাড়ি ঘেরাও ও তাতে অগ্নিসংযোগ করল । রাজপথে রক্তের বন্যা বইতে থাকল ।

অবস্থাদৃষ্টে পুলিশ ও ইপিআর বাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়ল। ক্রমে তারা নিষ্ক্রিয় হতে থাকল, সরকার সেনাবাহিনীকে লেলিয়ে দিলেন। কিন্তু ক্ষুব্ধ জনগণ তাদের লক্ষ্য পূরণে অটল থাকলেন।

 

০৫. SAC এর ১১ দফা কর্মসূচি উল্লেখ কর।
অথবা, ছাত্রদের ১১ দফা আন্দোলনের কর্মসূচি কী ছিল?

উত্তরঃ ভূমিকা : পাকিস্তানের রাজনৈতিক ইতিহাসে ছাত্রদের ১১ দফা দাবি বা কর্মসূচি এক উল্লেখযোগ্য ঘটনা। ৬ দফা কর্মসূচির প্রতি সর্বাত্মক সমর্থনসহ ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ একটি ১১ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করে।

১১ দফা কর্মসূচিকে বলা হয় গণআন্দোলনের প্রাথমিক সূতিকাগার। পরবর্তীকালে তা ৬ দফা কর্মসূচির সাথে মিলিতভাবে বাংলাদেশের মানুষের মুক্তি ও স্বাধিকার আন্দোলনকে উৎসাহিত করে ।

SAC এর ১১ দফা কর্মসূচি নিম্নে ঝঅঈ এর ১১ দফা কর্মসূচি উল্লেখ করা হলো :

১. জাতীয় শিক্ষা কমিশনের রিপোর্ট ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল কালাকানুন বাতিল ঘোষণা এবং বেতন ও অন্যান্য ফি কমিয়ে শিক্ষার ব্যয় সংকোচনের ব্যবস্থা করতে হবে।

২. সর্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে হবে।

স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস (৭ম-সংক্ষিপ্ত) *

৩. সার্বভৌম ক্ষমতাসম্পন্ন যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন করা এবং একই ব্যবস্থায় দেশ রক্ষা, পররাষ্ট্র ও মুদ্রা সংক্রান্ত বিষয় কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে রাখা ।

৪. পশ্চিম পাকিস্তানের বেলুচিস্তান, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ, সিন্ধুসহ প্রত্যেক প্রদেশের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন প্রদান করে দেশের পশ্চিম অংশে একটি সাব-ফেডারেশন গঠন করার ব্যবস্থা করতে হবে।

৫. ব্যাংক, বিমা, ইন্স্যুরেন্স ও বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ করতে হবে।

৬. কৃষকের ওপর থেকে খাজনা ও ট্যাক্সের বোঝা হ্রাস করা, বকেয়া খাজনা ও ঋণ মওফুক করা, সার্টিফিকেট প্রথা বাতিল করা, পাট, আখের ন্যায্যমূল্য প্রদান করতে হবে।

৭. ক. শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি ও বোনাস প্রদান করতে হবে
খ. শিক্ষা, চিকিৎসা ও বাসস্থানের সুবিধা প্রদান করতে হবে।
গ. শ্রমিকদের স্বার্থবিরোধী সকল ধরনের নিয়মকানুন বাতিল করতে হবে ।
ঘ. ট্রেড ইউনিয়ন গঠন করার অধিকার প্রদান করতে হবে ।

৮. পূর্ব পাকিস্তানের বন্যা নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে এবং পানি সম্পদের সার্বিক সদ্ব্যবহারের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস (৭ম-সংক্ষিপ্ত) *

৯. সকল প্রকার নিরাপত্তামূলক আইন, জরুরি অবস্থা আইন, নির্যাতনমূলক আইন ও অন্যান্য নিবর্তনমূলক আইন বাতিল করতে হবে।

১০. সিয়াটো (SEATO), সেন্টো (CENTO), পাকিস্তান ও মার্কিন সামরিক চুক্তি বাতিল করা এবং জোট বহির্ভূত স্বাধীন ও নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করা।

১১. তথাকথিত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার সকল আসামিসহ দেশের বিভিন্ন কারাগারে আটক সকল রাজবন্দির গ্রেফতারি পরোয়ানা বাতিল ঘোষণা করতে হবে।

উপসংহার : পরিশেষে বলা যায় যে, ১১ দফা দাবি ছিল তৎকালীন ছাত্র সমাজের খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি কর্মসূচি।

আইয়ুব সরকারের সামরিক শাসন, মনগড়া সংবিধান প্রণয়ন, জনগণের অধিকার খর্ব, নির্যাতন, নিপীড়ন, অত্যাচার ও মামলা-হামলার বিরুদ্ধে ছাত্রসমাজের ১১টি দাবি ছিল।

ছাত্রসমাজের ১১ দফা দাবিই ছিল ১৯৭০ সালের নির্বাচনের নির্বাচন ও পূর্ববাংলার মানুষের সকল দাবি ফিরিয়ে আনার দাবিস্বরূপ।

 

০৬. ১১ দফা আন্দোলন কী?
অথবা, ১১ দফা আন্দোলন বলতে কী বুঝ?

উত্তরঃ ভূমিকা : পাকিস্তানের রাজনৈতিক ইতিহাসে ছাত্রদের ১১ দফা দাবি বা কর্মসূচি এক উল্লেখযোগ্য ঘটনা। ১১ দফা ছিল ছাত্রসমাজের গৃহীত রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক কর্মসূচি।

এ কর্মসূচি ১৯৬৮-৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের ক্ষেত্রে এক বিরাট ভূমিকা পালন করে। পরবর্তীকালে তা ৬ দফা কর্মসূচির সাথে মিলিতভাবে বাংলাদেশের মানুষের মুক্তি ও স্বাধিকার আন্দোলনকে বেগবান করে।

১১ দফা আন্দোলনঃ ৬ দফা কর্মসূচির প্রতি সর্বাত্মক সমর্থনে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ একটি ১১ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করে। ১১ দফা কর্মসূচিকে বলা হয় গণআন্দোলনের প্রাথমিক সূতিকাগার।

তৎকালীন পাকিস্তানের উভয় অংশে যখন আইয়ুববিরোধী – আন্দোলনে মুখর, তখনই ১৯৬৯ সালের ৫ জানুয়ারি ডাকসু কার্যালয়ে তৎকালীন ডাকসুর সহ-সভাপতি তোফায়েল আহমেদের সভাপতিত্বে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ (East Pakistan Student’s League EPSL), পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন (East Pakistan Student’s Union- EPSU) এবং জাতীয় ছাত্র ফেডারেশন (National Student’s Federation-NSF) এর একাংশ সম্মিলিতভাবে একটি যুক্তফ্রন্ট গঠন করে।

স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস (৭ম-সংক্ষিপ্ত) *

এ ফ্রন্টের নামকরণ করা হয় Students Action Committee (SAC) বা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। দেশে যখন একটি সুষ্ঠু ও নিয়ন্ত্রিত নেতৃত্বের অভাব তখনই ‘ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’ সমগ্র আন্দোলনের নেতৃত্ব নিজের হাতে নিয়ে নেয়।

আইয়ুব সরকার কর্তৃক আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করার পর সবাই বুঝতে পারে যে, পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বাঙালিকে জাতি হিসেবে চিরদিন দমিয়ে রাখতে চায়।

এদিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও ৬ দফাপন্থি অন্যান্য আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ ১৯৬৬ সাল থেকে বন্দি অবস্থায় কারাভ্যন্তরে থাকার কারণে বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের নেতৃত্বভার সচেতন ও দায়িত্বশীল ছাত্রসমাজের ওপর বর্তায়।

তাই ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ উক্ত তারিখেই ৬ দফাকে সাথে নিয়ে ছাত্র-শিক্ষক, কৃষক-শ্রমিক ও মেহনতি মানুষের দাবি সংবলিত ১১ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করে। এই কর্মসূচি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে যে আন্দোলন শুরু হয় তাকে ১১ দফা আন্দোলন বলে ।

উপসংহার : পরিশেষে বলা যায় যে, ১১ দফা দাবি ছিল। তৎকালীন ছাত্রসমাজের খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি কর্মসূচি। আইয়ুব সরকারের সামরিক শাসন, মনগড়া সংবিধান প্রণয়ন, জনগণের অধিকার খর্ব, নির্যাতন, নিপীড়ন, অত্যাচার ও মামলা-হামলার বিরুদ্ধে ছাত্রসমাজের ১১টি দাবি ছিল। ৬ দফা কর্মসূচি ছিল মধ্যবিত্ত শ্রেণির জন্য; কিন্তু ১১ দফা ছিল কৃষক শ্রমিকসহ সর্বস্তরের জনসাধারণের স্বার্থে গৃহীত একটি ন্যায্য ও সময়োপযোগী কর্মসূচি।

 

০৭. ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ১১ দফা কর্মসূচির গুরুত্ব লেখ।
অথবা, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ১১ দফা আন্দোলনের গুরুত্ব বর্ণনা কর।

উত্তরঃ ভূমিকা : পাকিস্তানের রাজনৈতিক ইতিহাসে ১১ দফা দাবি বা কর্মসূচির গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। ১১ দফা দাবির মধ্যে শুধু ৬ দফাভিত্তিক আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের কথাই ছিল না; বরং এর সাথে সর্বজনীন ভোটাধিকার, প্রত্যক্ষ নির্বাচন ও সংসদীয় গণতন্ত্রের দাবিও অন্তর্ভুক্ত ছিল।

প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে ১৯৬৯ সালের ৫ জানুয়ারি তিনটি ছাত্র সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ এই কর্মসূচি ঘোষণা করে।

ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ১১ দফা কর্মসূচির গুরুত্ব : নিম্নে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ১১ দফা কর্মসূচির গুরুত্ব আলোচনা করা হলো :

১. জাতীয় স্বার্থ প্রতিষ্ঠা : ছাত্রদের ১১ দফা কর্মসূচি একটি ছাত্র আন্দোলন হলেও এটি ছিল মূলত পূর্ববাংলার আপামর জনগণের স্বার্থরক্ষার অন্যতম হাতিয়ার। এতে জনগণের স্বার্থের বিষয়টি সর্বাধিক গুরুত্ব লাভ করে ।

স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস (৭ম-সংক্ষিপ্ত) *

২. আন্দোলনের গতিধারা নির্দিষ্টকরণ : শেখ মুজিবুর রহমানকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় আটক করা হলে পূর্বপাকিস্তানের জনসমাজ বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। এসময় সচেতন ছাত্রসমাজের বিখ্যাত ১১ দফা বিক্ষুব্ধ জনসমাজকে সুসংগঠিত করে গণআন্দোলনের সঠিক গতিধারা নির্ধারণে সহায়ক ভূমিকা পালন করে

৩. নিম্নমধ্যবিত্তের স্বার্থ সংরক্ষণ : ছাত্রসমাজের ১১ দফা ছিল পূর্বপাকিস্তানের কৃষক-শ্রমিক তথা মেহনতি মানুষের সার্বিক স্বার্থ সংরক্ষণজনিত কর্মসূচি। তাই ১১ দফা রাজনৈতিক অঙ্গনে নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণির স্বার্থ উদ্ধারের মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয় ।

৪. দলগত ঐক্য গঠন : ছাত্রসমাজের ১১ দফা আন্দোলনের তীব্রতা রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐক্যসূত্র গড়ে তোলার অনুপ্রেরণা জোগায়। যার অবশ্যম্ভাবী পরিণতিতে ৮টি রাজনৈতিক দল ”DAC’ (Democratic Action Committee) গঠন করে।

৫. SAC গঠন পূর্বপাকিস্তানের তৎকালীন ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন এবং ছাত্র ফেডারেশনের একাংশ মিলিত হয়ে SAC (Student Action Committee) গঠন মূলত ১১ দফারই অন্যতম ফসল। মূলত উক্ত ছাত্রসংগ্রাম কমিটিই গণআন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকায় অবতীর্ণ হয় ।

স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস (৭ম-সংক্ষিপ্ত) *

৬. স্বাধীনতা আন্দোলন : গণআন্দোলনে স্বৈরাচারী আইয়ুব সরকারের পতন ঘটে। বিখ্যাত ৬ দফা এবং ছাত্রসমাজের ১১ দফাকে কেন্দ্র করেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সূচনা হয় এবং এই আন্দোলনের মাধ্যমে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে।

তাই ১১ দফা ছিল বাঙালি জাতির স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ।

উপসংহার : পরিশেষে বলা যায় যে, ১১ দফা দাবি ছিল তৎকালীন ছাত্রসমাজের খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি কর্মসূচি।

আইয়ুব সরকারের সামরিক শাসন, মনগড়া সংবিধান প্রণয়ন, জনগণের অধিকার খর্ব, নির্যাতন, নিপীড়ন, অত্যাচার ও মামলা-হামলার বিরুদ্ধে ছাত্রসমাজের ১১ দফা সংবলিত দাবি ছিল।

৬ দফা কর্মসূচি ছিল মধ্যবিত্ত শ্রেণির জন্য; কিন্তু ১১ দফা ছিল কৃষক শ্রমিকসহ সর্বসাধারণের স্বার্থে গৃহীত কর্মসূচি।

 

০৮. ১৯৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানের ফলাফল আলোচনা কর ।
অথবা, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের ফলাফল কী ছিল?

উত্তরঃ ভূমিকা ১৯৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানের সাথে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা সংগ্রামের একটি প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রয়েছে মূলত ১৯৬৬ সালের ৬ দফার মাধ্যমে যে স্বাধিকার আন্দোলনের সূচনা হয় ১৯৬৯ সালে তা এক ধাপ এগিয়ে নেওয়া হয় এবং ১৯৬৯ সালের এই গণঅভ্যুত্থানের শেষ পরিণতি ঘটে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের মধ্য দিয়ে।

১৯৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানের ফলাফল : ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের ফলাফল সম্পর্কে নিম্নে আলোচনা করা হলো :

১. জাতীয়তাবোধের বিকাশ : ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের পরিপ্রেক্ষিতে বাঙালি জাতীয়তাবাদের ক্রমোন্নয়নমূলক বিকাশ ঘটে ।

২. রাষ্ট্রীয় কাঠামোর বিরুদ্ধে জনমত গঠন পাকিস্তানি রাষ্ট্রকাঠামোর বিরুদ্ধে পূর্ববাংলার সর্বস্তরের জনগণের রায় স্পষ্ট হয়।

৩. আইয়ুব প্রশাসনের মনোবল ভাঙন : নভেম্বর ১৯৬৮ থেকে মার্চ ১৯৬৯ পর্যন্ত আইয়ুববিরোধী আন্দোলন এবং ব্যাপক গণঅভ্যুত্থানের কারণে পাকিস্তানের সামরিক বেসামরিক আমলাতান্ত্রিক এলিটদের মনোবল ভেস্তে যায়।

স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস (৭ম-সংক্ষিপ্ত) *

৪. ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচন : ব্যাপক গণআন্দোলনের মুখে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর ভিত নড়ে ওঠে এবং তারা বাধ্য হয়ে ১৯৭০ সালের নির্বাচনের ঘোষণা প্রদান করে।

৫. জনসচেতনতা সৃষ্টি : এ অভ্যুত্থানের ভিতর দিয়ে শ্রেণি ও অঞ্চলগত বিবিধ শোষণের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠতম চেতনার অভিব্যক্তিও প্রসারিত হয়।

৬. বৈষম্যের বিরুদ্ধে জনরোষ সৃষ্টি ১৯৬৮-৬৯ সালের ব্যাপক গণঅভ্যুত্থানের প্রত্যক্ষ সংগ্রাম, হরতাল, ঘেরাও আন্দোলনের দিনগুলো সেসময় এবং ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধকালে শ্রেণিভেদ ও আঞ্চলিক বৈষম্য ও শোষণের অপসারণ ঘটিয়ে পূর্ববাংলায় পৃথক রাষ্ট্রব্যবস্থা কায়েম করতে উল্লেখযোগ্য প্রভাব রাখতে পেরেছিল ।

৭. স্বাধীনতা অর্জন : এ গণআন্দোলনকে ভিত্তি করে বাঙালি জাতি স্বাধীনতা সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ হয় এবং মাত্র দুই বছর পরই সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীনতা লাভ করে ।

৮. অধিকার আদায়ের হাতিয়ার : ১৯৬৯ সালের গণআন্দোলন ছিল শোষকের কাছ হতে শোষিতের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের হাতিয়ারস্বরূপ ।

৯. চেতনার পরিবর্তন : ৬৯ সালে সংঘটিত এই গণআন্দোলন পুরো সমাজের ও জনগণের চেতনায় নজিরবিহীন প্রভাব বিস্তার করে এবং স্থায়ী ছাপ রাখতে সক্ষম হয়।

উপসংহারঃ পরিশেষে বলা যায় যে, গণঅভ্যুত্থান ছিল পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরবর্তীকালে সংগঠিত সর্ববৃহৎ গণআন্দোলন । আন্দোলনের ফলাফল অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী ছিল । এ আন্দোলনের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের মধ্যে সংগ্রামী চেতনা জাগ্রত হয়।

তাই তিন বছর গণআন্দোলন চালিয়ে পূর্ব পাকিস্তানি বা স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠা করতে প্রয়াসী হয়। জন্ম হয় স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের।

 

০৯. ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের গুরুত্ব মূল্যায়ন কর।
অথবা, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের গুরুত্ব/তাৎপর্য সংক্ষেপে আলোচনা কর ।

উত্তরঃ ভূমিকা : গণঅভ্যুত্থানের ফলে আইয়ুব খান ১৯৬৯ সালে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন এবং জেনারেল ইয়াহিয়া খান ক্ষমতা দখল করেন। এছাড়াও এ আন্দোলনের সুদূরপ্রসারী প্রভাব রয়েছে ।

কেননা এ আন্দোলনই স্বাধীন বাংলাদেশের ভিত্তি স্থাপন করেছিল । স্বাধীনতা যুদ্ধের আগ মুহূর্তে এ আন্দোলনের মাধ্যমেই জনগণ সবচেয়ে বেশি সংগঠিত হয়।

১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের গুরুত্ব : নিম্নে ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের গুরুত্ব আলোচনা করা হলো :

১. আগরতলা মামলা প্রত্যাহার : রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে ১৯৬৮ সালের জানুয়ারি মাসে শেখ মুজিবকে প্রধান আসামি করে মোট ৩৪ জনের বিরুদ্ধে আইয়ুব-মোনায়েম চক ‘আগরতলা মামলা’ নামে এক মিথ্যা মামলা দায়ের করে।

কিন্তু ছাত্র-জনতার তীব্র আন্দোলনের মুখে আইয়ুব খান ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি আগরতলা মামলা প্রত্যাহার করে নেয় ।

স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস (৭ম-সংক্ষিপ্ত) *

২. গোলটেবিল বৈঠক আহ্বান : রাজনৈতিক সংকট নিরসনের লক্ষ্যে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান ১৯৬৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে রাওয়ালপিণ্ডিতে সর্বদলীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের এক গোলটেবিল বৈঠক আহ্বান করে।

শেখ মুজিব বৈঠকে যোগ দিলেও স্বায়ত্তশাসনের দাবি না মানায় তিনি বৈঠক বর্জন করেন।

৩. আইয়ুব খানের পতন : শেখ মুজিবুর রহমান ৬ দফা ও ১১ দফা বাস্তবায়নের দাবিতে জনগণকে নিয়ে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করলে পাকিস্তানকে টিকিয়ে রাখার অভিপ্রায়ে স্বৈরাচারী আইয়ুব খান ১৯৬৯ সালের ২৫ মার্চ সেনাবাহিনীর প্রধান ইয়াহিয়া খানের ওপর শাসনক্ষমতা অর্পণ করে রাজনীতি থেকে চিরবিদায় নেন। তাই আইয়ুব খানের পতনে গণঅভ্যুত্থানের গুরুত্ব ব্যাপক।

স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস (৭ম-সংক্ষিপ্ত) *

৪. সত্তরের সাধারণ নির্বাচন : ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষিতে পাকিস্তানের শাসনব্যবস্থার অবনতি ঘটে। তাই শাসনতান্ত্রিক ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটাতে ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। কেন্দ্রীয় সরকার গঠনের ক্ষেত্রে এ নির্বাচন ছিল খুবই তাৎপর্যপূর্ণ ।

৫. স্বাধীনতা লাভ : পাকিস্তান সামরিক জান্তা ৬৯ এর গণআন্দোলনকে স্তব্ধ করার শত প্রচেষ্টা চালিয়েও সফল হয়নি এ আন্দোলন পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলাদেশ সৃষ্টিতে সহায়তা করে।

বাঙালি জাতি ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের মাধ্যমে নিজেদের অধিকার ও স্বাধীনতা লাভের যে শপথ নেয় তা ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাস্তবরূপ নেয় ।

উপসংহার : পরিশেষে বলা যায় যে, ১৯৬৯ সালের গণআন্দোলনে পূর্ববাংলা ব্যাপক লাভবান হয়। কেননা এ অভ্যুত্থানের কারণেই স্বৈরাচারী আইয়ুব সরকার ১৯৬৯ সালের ২৫ মার্চ পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।

তাই একথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, ১৯৬৯ সালের আন্দোলন বাংলা বা বাঙালিদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল ।

উক্ত বিষয় সম্পর্কে কিছু জানার থাকলে কমেন্ট করতে পারেন।
আমাদের সাথে ইউটিউব চ্যানেলে যুক্ত হতে এখানে ক্লিক করুন এবং আমাদের সাথে ফেইজবুক পেইজে যুক্ত হতে এখানে ক্লিক করুন
গুরুত্বপূর্ণ আপডেট ও তথ্য পেতে আমাদের ওয়েবসাইটে ভিজিট করুন।

Check Also

স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস (১০ম-সংক্ষিপ্ত)

স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস (১০ম-সংক্ষিপ্ত)

স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস (১০ম-সংক্ষিপ্ত) প্রশ্নোত্তর ও সাজেশন সম্পর্কে আজকে বিস্তারিত সকল কিছু জানতে পারবেন। …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *