রাজনৈতিক তত্ত্ব পরিচিতি: রুশো রচনামূলক প্রশ্নোত্তর PDF

রাজনৈতিক তত্ত্ব পরিচিতি: রুশো রচনামূলক প্রশ্নোত্তর PDF ও রাজনৈতিক তত্ত্ব পরিচিতি: রুশো রচনামূলক প্রশ্নোত্তর PDF সহ শিক্ষমূলক সকল বিষয় পাবে এখান থেকে: অধ্যায় ৫.৮ : রুশো, এর অতিসংক্ষিপ্ত, প্রশ্নোত্তর,সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর

ও রচনামূলক প্রশ্নোত্তর, সাজেশন সম্পর্কে আজকে বিস্তারিত সকল কিছু জানতে পারবেন। সুতরাং সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি মনোযোগ দিয়ে পড়ুন। অনার্স ১ম বর্ষের যেকোন বিভাগের সাজেশন পেতে জাগোরিকের সাথে থাকুন।

রাজনৈতিক তত্ত্ব পরিচিতি: রুশো রচনামূলক প্রশ্নোত্তর PDF

রচনামূলক প্রশ্নোত্তর বাকী অংশ

রচনামূলক প্রশ্নোত্তর বাকী অংশ

রচনামূলক প্রশ্নোত্তর বাকী অংশ

অনার্স প্রথম বর্ষ
বিষয়ঃ রাজনৈতিক তত্ত্ব পরিচিতি
অধ্যায় ৫.৮ : রুশো
বিষয় কোডঃ ২১১৯০৯

গ-বিভাগঃ রচনামূলক প্রশ্নোত্তর

০৬. “ রুশো গণতন্ত্রী ছিলেন, সর্বাত্মকবাদী নন ।” উক্তিটি পর্যালোচনা কর।
অথবা, গণতন্ত্র সম্পর্কে রুশোর ধারণা ব্যাখ্যা কর।

উত্তর : ভূমিকা: ফরাসি জ্ঞানালোকের অন্যতম পথিকৃত; সাম্য, মৈত্রী, স্বাধীনতার দিশারি, ফরাসি বিপ্লবের রূপকার জ্যা জ্যাক রুশো। রুশোর সাধারণ ইচ্ছার মতবাদ বিশ্লেষণ করে কেউ কেউ একে গণতন্ত্রের মূর্ত প্রতীক আবার কেউ কেউ রাষ্ট্রীয় সর্বাত্মক ক্ষমতার অভিব্যক্তি বলে উল্লেখ করেছেন।

রুশো তার বিখ্যাত ”The Social Contract” গ্রন্থে বলেন, “Man is born free but everywhere he is in chains.” তার এই উক্তি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় একদিকে তিনি গণতন্ত্রের কথা বলেছেন অন্যদিকে সর্বাত্মকবাদকে সমর্থন করেছেন।

“রুশো গণতন্ত্রী ছিলেন, সর্বাত্মকবাদী নন” উক্তিটির পর্যালোচনা : রাষ্ট্রদর্শনে রুশোর বিভিন্ন মতবাদসমূহ আলোচনা করলে দেখা যায় যে, তার সব মতবাদে গণতান্ত্রিক ভাবধারা ফুটে উঠেছে। তিনি সবসময়ই গণতন্ত্রের জয়গান গেয়েছেন ।

তার বিভিন্ন মতবাদে গণতন্ত্রের সুর প্রতিধ্বনিত হয়েছে। রাষ্ট্রদর্শনে তার মতবাদসমূহ আলোচনা করলেই প্রমাণিত হয় যে, রুশো একজন সর্বাত্মকবাদী, গণতন্ত্রী নন। নিম্নে এ সম্পর্কে পর্যালোচনা করা হলো,

১. জনসার্বভৌমত্ব : রুশো রাষ্ট্রের সব ক্ষমতা জনগণের হাতে ন্যস্ত করেন। তিনি বলেন, জনগণ নিজেরা জোটবদ্ধ হয়ে সার্বভৌম ক্ষমতার প্রয়োগ করবে। এটি তার গণতান্ত্রিক চিন্তার রূপ।

কেননা আধুনিক গণতন্ত্রে জনগণের সার্বভৌমত্ব স্বীকৃত। সুতরাং বলা যায় যে, রুশো একজন গণতন্ত্র মনস্ক দার্শনিক, তিনি সর্বাত্মকবাদী নন।

২. ব্যক্তিস্বাধীনতা: রুশোর মতে, প্রকৃতির রাজ্যে প্রতিটি মানুষ ছিল স্বাধীন। মানুষ স্বাধীনভাবে জন্মগ্রহণ করে। তার এ মন্তব্য ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী মনোভাবকে সমর্থন করে। ব্যক্তিস্বাধীনতা ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ গণতন্ত্রের মূলভিত্তি ।

৩. স্বাধীনতা সম্পর্কে ধারণা : রুশো বলেন যে, মানুষ স্বাধীনতা চায়। রাষ্ট্রীয় সংগঠনের অধীনে মানুষ নৈতিকতাকে পূর্ণাঙ্গভাবে বিকশিত করতে পারে। আর গণতন্ত্রের আদর্শ হচ্ছে নীতিজ্ঞানসম্পন্ন নাগরিক তৈরি করা। তাই বলা যায়, রুশোর স্বাধীনতা নিছক রাজনৈতিক নয়; বরং নৈতিক ।

৪. জনগণের অংশগ্রহণ : গণতন্ত্রের মূলমন্ত্র হচ্ছে জনগণের অংশগ্রহণ। রুশোর সাধারণ ইচ্ছাতত্ত্বে জনগণের অংশগ্রহণ ও কল্যাণকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও রাষ্ট্রীয় কাজে জনগণের অংশগ্রহণকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। তাই বলা যায়।
যে, রুশো একজন গণতান্ত্রিক দার্শনিক বলেই তিনি তার সাধারণ ইচ্ছাতত্ত্বে জনগণের অংশগ্রহণকে গুরুত্ব দিয়েছেন।

৫. আইনের প্রাধান্য : রুশো বলেন, গণসম্মতির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয় আইন। এ আইন সবার মেনে চলা উচিত। আর আইনের উদ্দেশ্যই হলো জনকল্যাণ। তাই রুশো তার The Social Contract” গ্রন্থে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার কথা বলেছেন । তিনি মনে করেন সার্বভৌম ক্ষমতা আইনের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয় ।

৬. সরকার গঠন : রুশোর সাধারণ ইচ্ছাতত্ত্বে জনগণ নিজেদের কল্যাণের জন্য নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে সব দাবি পেশ করে। আর এ কর্তৃপক্ষ হচ্ছে গণতান্ত্রিক সরকারের রূপ।

গণতন্ত্রে জনপ্রতিনিধিরা আইন তৈরি ও প্রয়োগ করে এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশগ্রহণ করে থাকে। তাই রুশোকে অবশ্যই একজন গণতন্ত্রপন্থি দার্শনিক বলা যায়।

৭. সামাজিক ধর্ম: রুশোর বিভিন্ন মতবাদ আলোচনা পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, তিনি সামাজিক ধর্মের মাধ্যমে প্রতিটি মানুষকে স্বাধীনতা দানের পক্ষে, গণতন্ত্রেও এ স্বাধীনতা স্বীকৃত। তাই সামাজিক ধর্ম প্রতিষ্ঠায় রুশো অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন ।
এক্ষেত্রেও তিনি অনেকটাই গণতন্ত্রের সমর্থক।

৮. কল্যাণমূলক রাষ্ট্র : রুশো তার সাধারণ ইচ্ছাতত্ত্বে জনকল্যাণের কথা সর্বাগ্রে বর্ণনা করেছেন রুশোর সাধারণ ইচ্ছা মূলত জনকল্যাণমূলক। প্রকৃতির রাজ্যের মানুষ জনকল্যাণের ১. স্বার্থে রাষ্ট্রগঠনে আগ্রহী হয়। আর আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রও জনকল্যাণে ব্যস্ত সুতরাং দেখা যায় যে, এক্ষেত্রে রুশোর মতবাদ গণতান্ত্রিক ।

৯. সরকারের শ্রেণিবিভাগ : রুশো তার বিভিন্ন মতবাদে গণতন্ত্রের পরিচয় দিয়েছেন। সরকারের শ্রেণিবিভাগেও তিনি গণতান্ত্রিক পদ্ধতিকে সর্বাধিক গুরুত্ব প্রদান করেন । মতে, ।। তার গণতন্ত্র থেকে অন্যান্য সরকারের উদ্ভব ঘটেছে এবং এটিই হচ্ছে সর্বোৎকৃষ্ট শাসনব্যবস্থা ।

১০. সাম্য, মৈত্রী ও স্বাধীনতার প্রতীক : রুশো সাম্য, মৈত্রী, স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের দিশারি। সাম্য, স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র ছিল তার রাষ্ট্রদর্শনের মূল উপাদান। সাধারণ ইচ্ছাতত্ত্বের মধ্যে তিনি সাম্য, মৈত্রী, স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন ।

উপসংহার : উপর্যুক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় যে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে রুশোর মতবাদে সর্বাত্মকবাদের ছাপ দেখা গেলেও প্রকৃত অর্থে রুশো একজন গণতন্ত্রী ও ব্যক্তিস্বাধীনতার পূজারি।

তিনি সাধারণ ইচ্ছার প্রতি গুরুত্বারোপ করতে গিয়ে শাসকের স্বেচ্ছাচারিতার পথকে রুদ্ধ করে গণতন্ত্রের পথকেই হ সুগম করেছেন। তার রাষ্ট্রচিন্তার বিভিন্ন দিক আলোচনা করলে দেখা যায় যে, তিনি গণতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন। বস্তুত রুশোর সামগ্রিক চিন্তাধারার মূলে ছিল ব্যক্তি ও তার স্বাধীনতা । সর্বাত্মকবাদ প্রতিষ্ঠা করা তার উদ্দেশ্য ছিল না ।

০৭. রুশোকে কেন সর্বাত্মকবাদী দার্শনিক বলা হয়?
অথবা, “রুশো ছিলেন সর্বাত্মকবাদী দার্শনিক” ব্যাখ্যা কর।

উত্তর : ভূমিকা : অষ্টাদশ শতাব্দীর রাষ্ট্রদার্শনিক জ্যা জ্যাক রুশো ছিলেন ফরাসি জ্ঞানালোক আন্দোলনের অন্যতম প্রতিনিধি এবং ইউরোপের প্রগতিবাদী ও গণতান্ত্রিক সমাজ চেতনার প্রধান পৃষ্ঠপোষক।

যাদের কার্যকলাপ, শিক্ষা ও দৃষ্টিভঙ্গিকে সামনে রেখে ফ্রান্স হয়ে উঠেছিল সভ্যতার পথপ্রদর্শক, তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন রুশো। রুশো বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্রদর্শন সম্পর্কে যে মতবাদ প্রদান করেছেন তাতে কখনও তাকে গণতন্ত্রী আবার কখনও তাকে সর্বাত্মকবাদী বলে মনে হয়। তার রাষ্ট্রদর্শন বিশ্লেষণ করে অনেকেই তাকে সর্বাত্মকবাদী বলে মন্তব্য করেন।

রুশোকে সর্বাত্মকবাদী দার্শনিক বলার কারণ রুশোর রাষ্ট্রদর্শন ব্যাখ্যাবিশ্লেষণ করলে সর্বাত্মকবাদের পক্ষে তার কিছু মতামত পাওয়া যায় । নিম্নে সর্বাত্মকবাদ সম্পর্কে রুশোর মতামত আলোচনা করা হলো-

১. রাষ্ট্রই সর্বেসর্বা : সর্বাত্মকবাদের মূলমন্ত্র হলো রাষ্ট্রই সর্বেসর্বা। যেখানে রাষ্ট্রই মুখ্য আর জনগণ গৌণ বিষয় হিসেবে বিবেচিত। রুশো বিনাশর্তে রাষ্ট্রের হাতে সব ক্ষমতা অর্পণ করেন । জনগণ তাদের সব ক্ষমতা রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের হাতে ন্যস্ত করে রাষ্ট্র গঠন করেন। তাই রাষ্ট্র অত্যন্ত ক্ষমতাবান।

২. সাধারণ ইচ্ছার জন্ম : রুশো সাধারণ ইচ্ছা প্রতিষ্ঠার জন্য বলপ্রয়োগের আশ্রয় নিয়েছেন। তার মতে, সাধারণ ইচ্ছা চরম শক্তিশালী। এ ইচ্ছায় স্বেচ্ছাচারিতা ও সর্বাত্মকবাদের সম্ভাবনা থেকে যায় ।

৩. ব্যক্তিস্বার্থ বিরোধী: রুশোর বিভিন্ন মতবাদ আলোচনা পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, তার সব চিন্তাধারায় সমাজের স্বার্থ সব অবস্থাতেই ব্যক্তি স্বার্থের ঊর্ধ্বে হওয়ায় সমাজতান্ত্রিক ও একনায়ক দর্শন দারুণভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। সমাজতন্ত্র ব্যক্তির চেয়ে রাষ্ট্রকে বেশি প্রাধান্য দিয়ে থাকে যা সর্বাত্মকবাদের নামান্তর।

৪. সার্বভৌমিকতা প্রসঙ্গ : রুশোর ”The Social Contract” গ্রন্থটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, সেখানে সরকারকে সার্বভৌম ক্ষমতার আধার বলে মূল্যায়ন করা হয়েছে। রাষ্ট্র সম্পর্কে রুশো বলেন রাষ্ট্র হলো অসীম, অবিনশ্বর, অবিভাজ্য, প্রতিনিধিত্বহীন। রাষ্ট্র সম্পর্কে এরূপ মন্তব্য সর্বাত্মকবাদের পরিচয় বহন করে।

৫. ব্যক্তিস্বাধীনতা প্রসঙ্গ : রুশো তার প্রকৃতির রাজ্যে ব্যক্তিস্বাধীনতার কথা বলেছেন । তিনি বলেন, প্রকৃতির রাজ্যের মানুষ ছিল স্বাধীন। তিনি প্রকৃতির রাজ্যের মানুষকে স্বাধীন হতে বাধ্য করেছেন। মানুষকে বাধ্য করা সম্পর্কে তিনি যে উক্তি করেছেন তা সর্বাত্মকবাদী রাষ্ট্রনায়কদের স্বেচ্ছাচারিতা প্রশ্রয় দিয়েছে।

৬. সংখ্যালঘুদের স্বার্থের পরিপন্থি: রুশো প্রকৃতপক্ষে সর্বাত্মকবাদী না হলেও তিনি তার বিভিন্ন মতবাদে সর্বাত্মকবাদের বর্ণনা করেছেন । তিনি তার সাধারণ ইচ্ছা প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে সংখ্যালঘুদের স্বার্থে আঘাত করেছেন। তিনি তার প্রকৃত ইচ্ছাকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য সংখ্যালঘু শ্রেণির ওপর বলপ্রয়োগ করেছেন । যা সর্বাত্মকবাদকে প্রতিষ্ঠিত করেন।

৭. সরকারের উৎপত্তি : রুশো সরকারের উৎপত্তি প্রসঙ্গে বলেন, “সরকার কোনো চুক্তির মাধ্যমে সৃষ্টি হয়নি; বরং তা সার্বভৌম শাসকের আদেশের মাধ্যমে সৃষ্টি হয়েছে।” রুশোর এ মন্তব্যের মাধ্যমে বুঝা যায় যে, তিনি সর্বাত্মকবাদকে সমর্থন করেন।

৮. সামাজিক ধর্ম: রুশো তার মতবাদের দ্বারা সামাজিক ধর্ম নামে এক অভিনব তত্ত্বের সূচনা করেন। জনগণ যাতে আইন প্রণেতাদেরকে ভুল না বুঝে সে কারণে তিনি এই সামাজিক ধর্মের উদ্ভব ঘটান। রুশোর সামাজিক ধর্ম সব ধর্ম অনুশীলনের পথে প্রতিকূলতা সৃষ্টি করে সর্বাত্মকবাদের পরিচয় বহন করছে।

৯. রাষ্ট্রই সব ক্ষমতার অধিকারী : রুশোর মতে, রাষ্ট্রই সব ক্ষমতার অধিকারী তিনি মনে করেন, রাষ্ট্রের জনগণকে নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করার অধিকার একমাত্র রাষ্ট্রেরই রয়েছে। রুশো বলেন, রাষ্ট্র হলো অবিভাজ্য, অহস্তান্তরযোগ্য ও চরম সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী। রুশোর এ মতবাদে সর্বাত্মকরাদের পরিচয় পাওয়া যায়।

উপসংহার : উপর্যুক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় যে, রুশোকে সম্পূর্ণরূপে সর্বাত্মকবাদী বলা চলে না। রুশোর লক্ষ্য ছিল ব্যক্তিস্বার্থ ও জনকল্যাণ। অধ্যাপক হার্নশ রুশোকে একজন “শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী ও গণতন্ত্রী” বলে অভিহিত করেছেন।

রুশোর বিভিন্ন মতবাদ বিশ্লেষণ করলে তার গণতান্ত্রিক মতবাদের পাশাপাশি সর্বাত্মকবাদেরও কিছুটা বর্ণনা পাওয়া যায় যা তার রাষ্ট্রদর্শনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। সুতরাং ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ আর গণতন্ত্রের পাশাপাশি তিনি সর্বাত্মকবাদ প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন।

০৮. সামাজিক চুক্তি সম্পর্কে টমাস হবস, জন লক ও জ্যা জ্যাক রুশোর ধারণার তুলনামূলক আলোচনা কর।
অথবা, হবস, লক ও রুশোর সামাজিক চুক্তির তুলনামূলক বিশ্লেষণ কর।

উত্তর : ভূমিকা রাষ্ট্রচিন্তার জগতে হবস, লক এবং রুশো তিনটি অনন্য নাম। এ তিনজন রাষ্ট্রদার্শনিক তাদের লেখনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রের উৎপত্তি ও বিকাশ সম্পর্কে বিশদভাবে আলোকপাত করেছেন। তাদের রাষ্ট্রের উৎপত্তি সম্পর্কিত মতবাদগুলোর মধ্যে সামাজিক চুক্তি মতবাদ অন্যতম।

হবস, লক ও রুশো তাদের রচিত গ্রন্থসমূহে সামাজিক চুক্তি সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। তারা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন পরিবেশ পরিস্থিতির দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তাদের সামাজিক মতবাদকে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণে বর্ণনা করেছেন। তবে প্রত্যেকেই একমত যে, রাষ্ট্র জনগণের পারস্পরিক চুক্তির ফল।

সামাজিক চুক্তি : রাষ্ট্রদার্শনিকদের মতে, সামাজিক চুক্তি হলো রাষ্ট্রের উৎপত্তির কাল্পনিক মতবাদ। সামাজিক মতবাদ অনুসারে রাষ্ট্র বিধাতার সৃষ্টি নয়; বরং সমাজের জনগণের মাঝে চুক্তি সম্পাদনের ফলে রাষ্ট্রের উদ্ভব হয়েছে।

আদিম সমাজ কোনো রাষ্ট্রের অধীন ছিল না। এ আদিম অবস্থাকে সামাজিক চুক্তি মতবাদীরা প্রকৃতির রাজ্য হিসেবে উল্লেখ করেন। কালের বিবর্তনে প্রকৃতির রাজ্যের মানুষ চুক্তির মাধ্যমে রাষ্ট্র গঠনে উদ্যোগী হয় ।

হবসের সামাজিক চুক্তি : হবস প্রকৃতির রাজ্য সম্পর্কে বলেন যে, “প্রকৃতিগতভাবেই মানুষ সঙ্গীহীন, অসহায়, নোংরা, পশুবৎ, স্বার্থবাদী ও ক্ষণস্থায়ী।” হবসের মতে, এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ লাভ করার জন্য মানুষ চুক্তিবদ্ধ হয়ে একটি সমাজ প্রতিষ্ঠার কথা ভাবল। হবস একপাক্ষিক চুক্তির কথা বলেন। হবসের চুক্তির একটি বৈশিষ্ট্য হলো মানুষ চুক্তিবদ্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চুক্তিভঙ্গ করার অধিকার হারাল।

জন লকের সামাজিক চুক্তি : জন লক মনে করেন, প্রকৃতির রাজ্যের মানুষ ছিল স্বাধীন, মুক্ত। তারা নিজের মতো থাকত। তাদের স্বাধীনতা ছিল বন্ধনহীন। প্রকৃতির রাজ্যে শান্তি, সদিচ্ছা, পারস্পরিক সহযোগিতা থাকা সত্ত্বেও কিছু অসুবিধার কারণে এর স্বাচ্ছন্দ্য গতি ব্যাহত হয়।

এ অবস্থা থেকে মুক্তির উপায় হিসেবে লক সামাজিক চুক্তির কথা বলেন। লকের মতে, সামাজিক চুক্তি দুই প্রকার যথা : ১. সামাজিক চুক্তি, ২. সরকারি চুক্তি।

রুশোর সামাজিক চুক্তি : রুশো বলেন যে, প্রকৃতির রাজ্যের মানুষ স্বার্থপর, কলহপ্রিয় ও আত্মকেন্দ্রিক ছিল না। প্রকৃতির রাজ্যে কোনো স্থায়ী পরিবার ছিল না বলে তাদের মধ্যে প্রেম, ভালোবাসা, মায়ামমতা ছিল না।

রুশোর মতে, প্রকৃতির রাজ্যের মানুষের উদ্দেশ্য ছিল দুটি। ১. প্রতিকূল পরিবেশে নিজেকে রক্ষা, ২. নিজেকে ভালোবাসা। রুশোর মতে, “যেহেতু মানুষ বিদ্যমান শক্তিকে একত্রিত করা ছাড়া নতুন কোনো শক্তিকে জন্ম দিতে পারে না। তাই নিজেদের রক্ষার জন্য ঐক্যবদ্ধ হওয়া ব্যতীত কোনো গত্যন্তর ছিল না।”

হবস, লক ও রুশোর সামাজিক চুক্তির তুলনামূলক আলোচনা : হবস, লক ও রুশো তিনজন দার্শনিকই সামাজিক চুক্তি মতবাদের কথা বলেছেন। বিভিন্ন দিক থেকে তাদের সাদৃশ্য থাকলেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে তাদের মধ্যে বৈসাদৃশ্য লক্ষ করা যায়। নিম্নে হবস, লক ও রুশোর সামাজিক চুক্তির মধ্যে তুলনামূলক আলোচনা করা হলো,

১. চুক্তির ধরন : হবস, লক ও রুশোর সামাজিক চুক্তির ধরন ভিন্ন ধরনের। হবসের চুক্তির ধরন একপাক্ষিক তিনি রাজাকে সর্বময় ক্ষমতা প্রদান করে ন্যায়নীতির ঊর্ধ্বে স্থান দিয়ে জনগণকে তার অধীন করেছেন।

কিন্তু লকের সামাজিক চুক্তি হলো দ্বিপাক্ষিক। লক আইনসভাকে সর্বোচ্চ ক্ষমতা প্রদান করলেও আইনসভা জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য। লকের এ চুক্তি অনেকটাই গণতন্ত্রীমুখী।

রুশো তার সামাজিক চুক্তি প্রদানে হবসকে অনুসরণ করেন। রুশোর চুক্তিও একপাক্ষিক। তবে সম্পূর্ণ বিপরীত। রুশো রাজার পরিবর্তে জনগণকে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী করেছেন।

২. মানব প্রকৃতি : হবসের মতে, মানুষ স্বভাবতই স্বার্থপর । তার মতে, মানুষ স্বীয় স্বার্থরক্ষার তাড়নায় সদা অন্যের স্বার্থে আঘাত হানতে তৎপর। এক্ষেত্রে ভালো-মন্দ তার বিবেচ্য বিষয় নয়, স্বীয় স্বার্থ আদায় করাই তার মূল উদ্দেশ্য।

লক মানব প্রকৃতি সম্পর্কে সম্পূর্ণ ভিন্নমত পোষণ করেন। লকের মতে মানব প্রকৃতি শান্তিকামী ও সমাজ প্রবণ। মানব প্রকৃতি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে রুশো বলেন, মানুষ স্বাভাবিকভাবে ভালো । তার মতে, মানুষ সৎ, সুহৃদ, বন্ধুভাবাপন্ন এবং পরস্পরের প্রতি সহানুভূতিশীল ।

৩. প্রকৃতির রাজ্য : প্রকৃতির রাজ্য সম্পর্কে হবস, লক ও রুশো তিনজনই ভিন্ন মত প্রকাশ করেন। হবস মনে করেন প্রকৃতির রাজ্যের মানুষের মধ্যে যুদ্ধ বিগ্রহ বিরাজ করতো। সেখানে ন্যায় অন্যায় বলে কিছু ছিল না। কিন্তু লক হবসের সাথে একমত নন।

লকের মতে, প্রকৃতির রাজ্যের যুদ্ধাবস্থা নয় শান্তি, সদিচ্ছা, পারস্পরিক সহযোগিতা ও সাম্যের উপস্থিতি ছিল। তিনি বলেন, প্রকৃতির রাজ্যে আইন না থাকায় সেখানে প্রকৃতির আইন প্রচলিত ছিল । অন্যদিকে, রুশোর ধারণা প্রকৃতির রাজ্যের মানুষ ছিল সুখী, সমৃদ্ধ এবং নৈতিক গুণাবলির অধিকারী।

৪. সার্বভৌম ক্ষমতা : হবস মনে করেন, জনগণের পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে নিজেদের অধিকার, ক্ষমতা, স্বাধীনতা একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর হাতে অর্পণ করে। সার্বভৌম ক্ষমতা এখানে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী এবং তার কথাই আইন। অন্যদিকে লক সার্বভৌম ক্ষমতাকে দুইভাগে ভাগ করেন। একটি হলো ‘তাৎক্ষণিক’ অন্যটি ‘শেষ পর্যায়ের’।

তিনি তাৎক্ষণিকভাবে রাষ্ট্রকে সার্বভৌম করলেও শেষ পর্যন্ত একে জনগণের হাতে ন্যস্ত করেছেন। কিন্তু রুশোর সার্বভৌম ক্ষমতা সব আইনের উৎসের ন্যায় অন্যায়ের বিধানকারক এবং ব্যক্তি স্বার্থের ঊর্ধ্বে যা একে চরম পর্যায়ে পৌঁছে দিয়েছে।

৫. সার্বভৌম শক্তির প্রয়োজনীয়তা : হবস, লক ও রুশোর সামাজিক চুক্তি মতবাদ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, তিনজন দার্শনিকই সার্বভৌম শক্তির প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেছেন।

তারা প্রত্যেকেই বিশ্বাস করেন যে, প্রকৃতির রাজ্যের মানুষ সার্বভৌম শক্তির প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছিল এবং রাষ্ট্র গঠনের মাধ্যমে সার্বভৌম শক্তির নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর করেছিল।

৬. ব্যক্তিস্বাধীনতা : হবসের মতে, সামাজিক চুক্তি সম্পাদনের পর ব্যক্তির কোনো স্বাধীনতা থাকতে পারে না। কিন্তু রুশো মনে করেন সাম্য ও স্বাধীনতা মানুষের জন্মগত অধিকার। অপরদিকে, লক ব্যক্তিস্বাধীনতা রক্ষায় দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিলেন । তিনি তার চুক্তির শর্তাবলি সেভাবেই তৈরি করেন।

৭. চুক্তিকরণ : হবসের প্রকৃতির রাজ্যে মানুষের কোনো নিরাপত্তা ছিল না। এ কারণে মানুষ নিজেদের জীবনের নিরাপত্তা বিধানের জন্য পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে চুক্তিবদ্ধ হয়। কিন্তু লক সামাজিক চুক্তির অন্য কারণ নির্দেশ করেন। তার মতে,

প্রকৃতির আইনের কারণে যে অসুবিধাগুলো দেখা দেয় তা দূর করার জন্য মানুষ চুক্তিবদ্ধ হয়। অন্যদিকে, রুশো মনে করেন, প্রকৃতির রাজ্যের মানুষ প্রতিকূল পরিবেশ হতে নিজেকে রক্ষার জন্য সামাজিক চুক্তিতে আবদ্ধ হয় ।

উপসংহার : উপর্যুক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় যে, সামাজিক চুক্তি মতবাদের ক্ষেত্রে হবস, লক ও রুশোর মতবিরোধ থাকাটা স্বাভাবিক। কেননা তিনজনই তিনটি ভিন্ন সময় এবং পরিবেশ দ্বারা প্রভাবিত।

ইংল্যান্ডে যুদ্ধমুখী পরিস্থিতি যেমন হবস ও লককে প্রভাবিত করে তেমনি ফ্রান্সের সমাজব্যবস্থা রুশোর ওপর প্রভাব বিস্তার করে। তাই তাদের চুক্তির ধরন, বৈশিষ্ট্য ভিন্ন হওয়াই স্বাভাবিক। তবে তাদের চুক্তির বৈশিষ্ট্য ভিন্ন ভিন্ন হলেও তাদের চুক্তির উদ্দেশ্য একই। সাম্য, মৈত্রী, স্বাধীনতা ও সুবিচার প্রতিষ্ঠা করা।

উক্ত বিষয় সম্পর্কে কিছু জানার থাকলে কমেন্ট করতে পারেন।
আমাদের সাথে ইউটিউব চ্যানেলে যুক্ত হতে এখানে ক্লিক করুন এবং আমাদের সাথে ফেইজবুক পেইজে যুক্ত হতে এখানে ক্লিক করুন। গুরুত্বপূর্ণ আপডেট ও তথ্য পেতে আমাদের ওয়েবসাইটে ভিজিট করুন। ফ্রি পিডিএফ ফাইল এখান থেকে ডাউনলোড করে নিন। রাজনৈতিক তত্ত্ব পরিচিতি: রুশো রচনামূলক প্রশ্নোত্তর PDF

Check Also

PDF অনার্স প্লেটোপাশ্চাত্যের রাষ্ট্রচিন্তা সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর

PDF অনার্স প্লেটো:পাশ্চাত্যের রাষ্ট্রচিন্তা সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর

PDF অনার্স প্লেটো:পাশ্চাত্যের রাষ্ট্রচিন্তা সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ও অনার্স প্লেটো:পাশ্চাত্যের রাষ্ট্রচিন্তা, পর্ব – ১ ( প্রাচীন …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *