অনার্স রাজনৈতিক সেন্ট অগাস্টিন রচনামূলক প্রশ্নোত্তর PDF

অনার্স রাজনৈতিক সেন্ট অগাস্টিন রচনামূলক প্রশ্নোত্তর PDF ও অনার্স রাজনৈতিক সেন্ট অগাস্টিন রচনামূলক প্রশ্নোত্তর PDF সহ শিক্ষমূলক সকল বিষয় পাবে এখান থেকে: অধ্যায় ৫.২ : এরিস্টটল, এর অতিসংক্ষিপ্ত, প্রশ্নোত্তর,সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর

ও রচনামূলক প্রশ্নোত্তর, সাজেশন সম্পর্কে আজকে বিস্তারিত সকল কিছু জানতে পারবেন। সুতরাং সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি মনোযোগ দিয়ে পড়ুন। অনার্স ১ম বর্ষের যেকোন বিভাগের সাজেশন পেতে জাগোরিকের সাথে থাকুন।

অনার্স রাজনৈতিক সেন্ট অগাস্টিন রচনামূলক প্রশ্নোত্তর PDF

অনার্স প্রথম বর্ষ
বিষয়ঃ রাজনৈতিক তত্ত্ব পরিচিতি
অধ্যায় ৫.৩ : সেন্ট অগাস্টিন
বিষয় কোডঃ ২১১৯০৯

গ-বিভাগঃ রচনামূলক প্রশ্নোত্তর

০৪. সেন্ট অগাস্টিনের রাষ্ট্রদর্শন আলোচনা কর।
অথবা, সেন্ট অগাস্টিনের রাষ্ট্রচিন্তার গুরুত্ব বিশ্লেষণ কর।

উত্তর : ভূমিকা : রাষ্ট্রচিন্তার ইতিহাসে মধ্যযুগকে অন্ধকারাচ্ছন্ন যুগ বলে অভিহিত করা হলেও সেন্ট অগাস্টিন তার উদ্ভাবিত বিভিন্ন তত্ত্বের মাধ্যমে এ যুগের অন্ধকারাচ্ছন্ন রাজনৈতিক অবস্থায় কিছুটা হলেও আশার আলো দেখাতে চেষ্টা করেছিলেন।

অগাস্টিন গ্রিক ও রোমান সভ্যতা এবং খ্রিস্টীয় সভ্যতার সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে মানুষের জন্য এক অভয়বাণী উচ্চারণ করেন। মধ্যযুগের রাজনৈতিক ক্ষেত্রে তেমন কোনো পুস্তক রচিত না হলেও তিনি “The City of God” গ্রন্থ রচনা করে রাজনৈতিক ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হিসেবে আবির্ভূত হন।

সেন্ট অগাস্টিনের রাষ্ট্রদর্শন: সেন্ট অগাস্টিনের রাষ্ট্রদর্শন মধ্যযুগের ইতিহাসে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। নিম্নে সেন্ট অগাস্টিনের রাষ্ট্রদর্শন সম্পর্কে আলোচনা করা হলো-

১. ইতিহাসের ব্যাখ্যা প্রদান : সেন্ট অগাস্টিনের রাষ্ট্রদর্শনের অন্যতম একটি দিক হলো ধর্মতত্ত্বের নিরিখে ইতিহাসের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ প্রদান। ইতিহাসের সাধারণ ব্যবস্থার সাথে তিনি রোমান সাম্রাজ্যের পতনের বিশেষ ঘটনা সম্পর্কে নির্দেশ করে বলেন,

রোম সাম্রাজ্য খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করলেও তার সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ধারা প্যাগান আদর্শ ও ঐতিহ্যের সাথে সম্পৃক্ত ছিল বিধায় ধর্ম পরিকল্পনার সার্থক রূপদানের জন্য প্যাগান ভাবধারায় সম্পৃক্ত রোমান সাম্রাজ্যের পতন ছিল অবশ্যম্ভাবী।

খ্রিস্টানধর্মের অন্তর্নিহিত কোনো দুর্বলতা এর জন্য দায়ী ছিল না বরং তা ছিল ইতিহাসের স্বাভাবিক গতিরই অনিবার্য ফলশ্রুতি। ইতিহাসের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে অগাস্টিন অনেকটা মাউসের মতই শ্রেণি সংগ্রামের নীতি অবলম্বন করেছেন। এ ব্যাপারে তিনি স্বাভাবিক রাষ্ট্র ও বিশ্বজনীন রাষ্ট্রের স্টোয়িকবাদী আদর্শকে মূলভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেছেন ।

২. রাষ্ট্র সম্পর্কিত মতবাদ : সেন্ট অগাস্টিন তার ”The City of God” গ্রন্থে মানুষের দ্বৈতসত্তার পার্থক্য অনুসারে রাষ্ট্রকে দুই ভাগে বিভক্ত করেছেন । যথা : ক. বিধাতার রাষ্ট্র ও খ. পার্থিব রাষ্ট্র ।

ক. বিধাতার রাষ্ট্র : সেন্ট অগাস্টিনের মতে, বিধাতার রাষ্ট্র প্রতিনিধিত্ব করে মানুষের আত্মার। বিধাতার রাষ্ট্রের নাগরিকগণ অত্যন্ত ধর্মপ্রাণ এবং আত্মসুখ বিসর্জন দিয়ে স্রষ্টার প্রতি আসক্ত।

এ রাষ্ট্র মঙ্গলময, ঈশ্বরের আশীর্বাদপুষ্ট যা চিরভাস্বর এবং জ্যোতির্ময়। অগাস্টিন মনে করেন স্থায়ী সুখ একমাত্র বিধাতার রাষ্ট্রেই সম্ভব। যার কারণে বিধাতার সান্নিধ্য লাভকে এর অধিবাসীরা চরম প্রাপ্তি বলে মনে করেন ।

খ. পার্থিব রাষ্ট্র : পার্থিব রাষ্ট্র হচ্ছে মানুরে স্থূল ও দৈহিক গুণাবলির প্রতীক। এ রাষ্ট্র অহংকার ও স্বার্থের ওপর প্রতিষ্ঠিত। অগাস্টিনের মতে, নিষিদ্ধ গন্ধম ফল ভক্ষণে আদমের পতনের মধ্য দিয়ে যে পাপের সূচনা হয় পার্থিব রাষ্ট্র সেই পাপের ফলশ্রুতি।

এ রাষ্ট্র অস্থায়ী ও ধ্বংসশীল। পৃথিবীর বুকে যতদিন পাপ থাকবে ততদিন এ রাষ্ট্রও থাকবে। এরূপ রাষ্ট্রের লোকেরা কখনো প্রকৃত সুখ-শান্তি লাভ করতে পারবে না ।

৩. ন্যায়তত্ত্ব : অগাস্টিনের স্বর্গীয় রাষ্ট্রের ভিত্তি হলো ন্যায়তত্ত্ব । গ্রিক দার্শনিক প্লেটোর পর অগাস্টিনই প্রথম দার্শনিক যিনি ন্যায়বিচার সম্পর্কে মৌলিক ও তথ্যবহুল আলোচনা করেন। অগাস্টিনের মতে, যে রাষ্ট্রে ন্যায়-নীতি নেই সেখানে আইনও থাকতে পারে না।

তার মতে, কোনো প্রতিষ্ঠানের সদস্যবৃন্দ যখন উক্ত প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ব্যবস্থাপনার সাথে সংগতি বিধান করে তাদের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং উক্ত প্রতিষ্ঠান কর্তৃক আরোপিত দায়িত্ব-কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন থাকে, তখন সেখানে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয় এবং প্রতিষ্ঠানের সকল সদস্য ন্যায়বান বলে পরিগণিত হয়।

৪. শান্তি নীতি : ন্যায়বিচার তত্ত্বের ন্যায় সেন্ট অগাস্টিন শান্তি সম্পর্কেও মূল্যবান মতবাদ প্রদান করেছেন। সাধারণত যুদ্ধের অনুপস্থিতিকে শান্তি বলে অভিহিত করা হয়।

কিন্তু অগাস্টিন বলেন, শত্রু ব্যতীত যেমন যুদ্ধ হয় না তেমন সৌভ্রাতৃত্ব বা মিলনের অংশীদার ছাড়া শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয় না। প্রাকৃতিক আইনের গতিশীল ধারায় সকল মানুষ ও জীবজন্তু এ ইতিবাচক শান্তির অন্বেষণে লিপ্ত। বিশ্বজনীন দৈবরাষ্ট্র ব্যতীত সত্যিকার ন্যায়বিচার যেমন সম্ভব নয় তেমনি দৈবরাষ্ট্র ছাড়া সত্যিকারের শান্তিও অসম্ভব ।

৫. সম্পত্তি সম্পর্কে ধারণা : সেন্ট অগাস্টিন সম্পত্তি সম্পর্কে অত্যন্ত সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন মতামত প্রদান করেছেন। তার মতে সম্পত্তি হল বিধাতার দান। যা ঐশ্বরিক আইন ও মানবিক । আইনের ফলে সৃষ্টি হয়েছে।

একারণেই মানুষ তার ব্যক্তিগত টা অভাব পূরণের জন্য সম্পত্তি অর্জন করতে পারে। তবে তিনি ‘প্রয়োজন মতো’ কথাটির ওপর অধিকতর গুরুত্বারোপ করে বলেন যার যতটুকু প্রয়োজন ঠিক ততটুকুই যেন সে গ্রহণ করে এবং প্রত্যেকের প্রয়োজন মেটানোর পর অবশিষ্ট সম্পত্তি । সমাজের কল্যাণার্থে ব্যয় করবে।

৬. দাসপ্রথা সম্পর্কে ধারণা : অগাস্টিন দাসপ্রথাকে ন্যায়সংগত বলে অভিমত পোষণ করেছেন। তার মতে, স্রষ্টার দৃষ্টিতে সকল ষ্ট্র মানুষ সমান এবং জাতি, বর্ণ, বংশ নির্বিশেষে সকলের ওপর তার করুণা সমভাবে বর্ষিত।

অগাস্টিনের এই বিশ্বাসের প্রেক্ষিতে দাসপ্রথাকে ন্যায়সংগত বলা না গেলেও তিনি একে ন্যায়সংগত বলার পক্ষে যুক্তিবাদী। অগাস্টিন যুক্তি দেখান যে, দাসপ্রথা মানুষের পাপের ফল।

তার মতে, দাসদের ভাগ্য তাদের পাপের মাসুল ব্যতীত অন্য কিছু নয়। এজন্য তিনি দাসদের প্রতি সুবিচার এবং সদ্ব্যবহার করতে উপদেশ প্রদান করেন।

৭. মানব চরিত্র : সেন্ট অগাস্টিনের মতে, মানুষের জীবন দুটি অংশের সমন্বয়ে গঠিত। একটি তার দেহ বা শরীর, অন্যটি তার আত্মা। আত্মা মানুষকে স্বর্গীয় সুখের সন্ধানে ও সৎ পথে থাকার নির্দেশ দেন।

কিন্তু দেহ মানুষকে পার্থিব সুখ সন্ধানে প্ররোচিত করে। এক শ্রেণির মানুষ আত্মার প্রতিনিধিত্ব করে এবং বিধাতার নির্দেশিত পথে জীবনযাত্রা পরিচালনা করে স্থায়ী শান্তি অর্জন করে।

কিন্তু যারা দেহের প্রতিনিধিত্ব করে, পার্থিব সুখ লাভের বাসনা তাদের আচ্ছন্ন করে ফেলে এবং তাদের ওপর নেমে আসে পাপের বোঝা। ফলে তাদের জীবনে শুরু হয় দুঃখ ও যন্ত্রণার অধ্যায় ।

৮. রাষ্ট্র ও সরকার : অগাস্টিনের মতে, মানুষের কামনা-বাসনা থেকেই রাষ্ট্রের উৎপত্তি। সরকার বা শাসনব্যবস্থা কোনো পাপের ফলশ্রুতি নয় । পাপের ফলশ্রুতিতে রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়েছে।

তিনি বলেন, যেহেতু পার্থিব সুখ ভোগের আশায় মানুষ পাপ পথে পা বাড়ায় সেহেতু তাকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য রাষ্ট্র ও সরকারের প্রয়োজন। তাই প্রতিটি মানুষকে সরকার ও রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করা উচিত।

৯. রাষ্ট্রের উৎপত্তি সম্পর্কে মতবাদ : অগাস্টিনের রাষ্ট্রদর্শনের উল্লেখযোগ্য একটি দিক হলো রাষ্ট্রের উৎপত্তি সম্পর্কিত মতবাদ। রাষ্ট্রের উৎপত্তির প্রশ্নে তিনি ঐশ্বরিক মতবাদকে প্রাধান্য দিয়েছেন।

অগাস্টিন তার ‘দি সিটি অব গড’ গ্রন্থে রাষ্ট্রের জন্ম বৃদ্ধি ও ধ্বংসের ক্ষেত্রে ঈশ্বরের ইচ্ছার ভূমিকার কথা উল্লেখ করেন । ঈশ্বর তার ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটান কোনো রাষ্ট্রের উৎপত্তি বা পতনের মাধ্যমে। এর ওপর ভিত্তি করে অগাস্টিন তার রাষ্ট্রতত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করেন।

১০. রাষ্ট্রনায়ক সম্পর্কিত মতবাদ : রাষ্ট্রের শাসক সম্পর্কেও অগাস্টিনের তার নিজস্ব ধারণা ব্যক্ত করেছেন। তিনি মনে করেন, পার্থিব রাষ্ট্রের রাষ্ট্রনায়কগণ বিধাতার প্রতিনিধি হিসেবে বিশেষ ক্ষমতার অধিকারী হন।

তাই রাষ্ট্র নায়কের আদেশ পালন করা অপরাপর নাগরিকের জন্য অপরিহার্য এবং তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা অন্যায় ও পাপের সমতুল্য ।

১১. রাষ্ট্র ও গির্জা সম্পর্কে মতামত : অগাস্টিনের মতে, রাষ্ট্রের একমাত্র সংস্থা গির্জা যা মানুষের ভালোদিক বিবেচনা করে থাকে। তিনি আরও বলেন, বিধাতার রাষ্ট্রের শাসক স্বয়ং স্রষ্টা এবং গির্জা হচ্ছে এর প্রকৃত প্রতিনিধি।

গির্জার ব্যর্থতার অর্থ হলো রাষ্ট্রের ব্যর্থতা। তাই গির্জাকে উপেক্ষা করা কোনো রাষ্ট্রের উচিত নয়। গির্জার সাহায্যেই রাষ্ট্র তার নাগরিকদের শাশ্বত মুক্তির পথে পরিচালিত করতে পারে ।

উপসংহার : উপযুক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় যে, সেন্ট অগাস্টিন একমাত্র দার্শনিক যিনি তার সুচিন্তিত লেখনী ও তত্ত্বের মাধ্যমে মধ্যযুগীয় চিন্তাধারার গোড়াপত্তন করেন বিশেষ করে রোমান সাম্রাজ্যের পতনের পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন

জাতি কর্তৃক রোমান সভ্যতার সংস্কৃতি, আচার আচরণ ও জীবনযাত্রার প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা প্রতিরোধ করা ও রোমান জাতির ঐক্য ও সংহতি রক্ষায় অগাস্টিন তার রাষ্ট্রতত্ত্ব প্রদান করেন।

০৫. সেন্ট অগাস্টিনের ন্যায়বিচার তত্ত্ব আলোচনা কর ।
অথবা, সেন্ট অগাস্টিনের ন্যায়তত্ত্ব মূল্যায়ন কর।

উত্তর : ভূমিকা : মধ্যযুগের রাষ্ট্রচিন্তায় সেন্ট অগাস্টিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হলো ন্যায়তত্ত্ব বা ন্যায়বিচার তত্ত্ব। গ্রিক দার্শনিক প্লেটোর পর অগাস্টিনই প্রথম দার্শনিক যিনি ন্যায়বিচার সম্পর্কে মৌলিক ও তথ্যবহুল আলোচনা উপস্থাপন করেন।

গ্রিক ও রোমান সভ্যতা এবং খ্রিস্টীয় সভ্যতার সন্ধিস্থলে দাঁড়িয়ে সেন্ট অগাস্টিন তার ন্যায়তত্ত্বের অবতারণা করেন। মূলত অগাস্টিন খ্রিস্টধর্মের অনুশাসনে যে সর্বজনীন স্বর্গীয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কথা বলেছেন তার এক অপরিহার্য অনুসঙ্গ হলো এই ন্যায়-নীতি তত্ত্ব ।

সেন্ট অগাস্টিনের ন্যায়বিচার তত্ত্ব : সেন্ট অগাস্টিন তার ন্যায়তত্ত্ব বিশ্লেষণে প্লেটোর ভাববাদী দর্শন দ্বারা অধিকমাত্রায় প্রভাবিত হন। প্লেটোর মতে, আদর্শ রাষ্ট্রের ন্যায়বিচার তখনই প্রতিষ্ঠিত হবে যখন এ রাষ্ট্রের বিভিন্ন শ্রেণিভুক্ত মানুষ নিষ্ঠার সঙ্গে তাদের স্ব-স্ব দায়িত্ব ও কর্তব্য যথার্থভাবে পালন করে এবং রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে।

কিন্তু সেন্ট অগাস্টিনের মতে, স্বর্গীয় রাষ্ট্রের ভিত্তি হলো ন্যায়তত্ত্ব। অগাস্টিন ন্যায়বিচার বলতে বুঝিয়েছেন যে, নির্দিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠানের সদস্যবৃন্দ যখন উক্ত প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ব্যবস্থার সাথে সামঞ্জস্য রক্ষা করে তাদের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং উক্ত

প্রতিষ্ঠান কর্তৃক অর্পিত দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন থাকে, তখন বলা যায় যে, উক্ত প্রতিষ্ঠানে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং প্রতিষ্ঠানের সদস্যবৃন্দ ন্যায়পরায়ণ। তবে শর্ত হচ্ছে, এ প্রতিষ্ঠান যদি সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান না হয়ে উচ্চতর কোনো প্রতিষ্ঠানের অংশ বিশেষ হয় তবে এ ন্যায়বিচার চূড়ান্ত ন্যায়বিচার হতে পারে না, তা হবে আপেক্ষিক ন্যায়বিচার।

এ প্রসঙ্গে একটি পরিবার বা একটি বৃহত্তর সমাজের কথা ধরা যেতে পারে। যখন একটি পরিবারের সদস্যবৃন্দ উক্ত, পরিবার ব্যবস্থার সাথে সামঞ্জস্য বিধান করে পরিবার কর্তৃক অর্পিত দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন থাকে তখন ধরে নিতে হবে যে উক্ত পরিবারে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

কিন্তু এ পরিবার যে সমাজের অংশ সে সমাজের প্রতি এ পরিবারের যে দায়িত্ব ও কর্তব্য রয়েছে তা যদি পরিবার পালন না করে চলে তাহলে উচ্চ সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হলো না এবং পরিবারের সদস্যবৃন্দও ন্যায়পরায়ণ হলো না অগাস্টিন রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও অনুরূপ উদাহরণ স্থান করে ন্যায়তত্ত্বের ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন। তাই অগাস্টিন বলেন, সর্বোচ্চ ও সর্বজনীন রাষ্ট্র ব্যতীত অন্য কোনো সমাজের প্রেক্ষিতে চূড়ান্ত ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না ।

মূলত ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে অগাস্টিন তার বিধাতার রাষ্ট্রের ধারণাটি তুলে ধরেছেন। তিনি মনে করেন, খ্রিস্টান রাষ্ট্রের জন্মের পূর্বে যেসব রাষ্ট্রের উদ্ভব হয়েছিল, যেসব ক্ষেত্রে কোনো ন্যায়নীতি ছিল না।

অগাস্টিন এক্ষেত্রে সিসেরোর মতের প্রতিধ্বনি করে বলেন, ন্যায়-নীতি ব্যতীত সঠিক রাষ্ট্র গঠিত হতে পারে না। আর শুধু মাত্র খ্রিস্টান রাষ্ট্রে এ ন্যায়-নীতি কার্যকরী হতে পারে। কেননা, অগাস্টিন মনে করতেন, একমাত্র নিষ্ঠাবান খ্রিস্ট সম্প্রদায়ের লোকেরা ন্যায়সঙ্গত আচরণ করতে পারে তাই তাদের দ্বারাই রাষ্ট্রের ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।

সেন্ট অগাস্টিনের ন্যায়বিচার তত্ত্বের বৈশিষ্ট্য : সেন্ট অগাস্টিনের ন্যায়বিচার তত্ত্বের বৈশিষ্ট্য নিম্নে আলোচনা করা হলো-

১. ঈশ্বরের প্রতি আনুগত্য: অগাস্টিনের ন্যায়বিচার তত্ত্বের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো ঈশ্বরের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ। অগাস্টিনের মতে, যেখানে ন্যায়-নীতি প্রতিষ্ঠিত হয় সেখানে স্বাভাবিকভাবেই শান্তি বিরাজ করে।

তিনি বলেন, ন্যায়-নীতি এবং অপার সুখ-শান্তি সেই রাষ্ট্রে প্রবাহিত হয় যে রাষ্ট্রের জনগণ ঈশ্বরের প্রার্থনায় নিজেকে নিয়োজিত করে। তিনি আরও বলেন, ন্যায়বিচার কেবল সেই রাষ্ট্রেই প্রতিষ্ঠিত হতে পারে যেখানে জনগণ ও রাষ্ট্র খ্রিস্টীয় চার্চের নির্দেশ অনুযায়ী ঈশ্বরের আনুগত্য স্বীকার করে।

২. দৈব রাষ্ট্রের প্রাধান্য: ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় সেন্ট অগাস্টিন দৈবরাষ্ট্রের প্রাধান্য দিয়েছেন। কেননা, দৈবরাষ্ট্র পার্থিব কিংবা প্যাগান রাষ্ট্রের ন্যায় অন্যায়-অবিচার, লোভ-লালসা স্বার্থপরতা পরিপূর্ণ নয়। তাছাড়া দৈবরাষ্ট্র পার্থিব রাষ্ট্রের অধীনস্থ নয়; বরং পার্থিব রাষ্ট্রই দৈবরাষ্ট্রের অধীন। এজন্য সেন্ট অগাস্টিন মনে করেন, একমাত্র দৈবরাষ্ট্রই সর্বোচ্চ বা চূড়ান্ত ন্যায়বিচারের ক্ষমতা রাখে।

৩. সম্পত্তি রক্ষা: সেন্ট অগাস্টিনের মতে, রাষ্ট্রের শান্তিশৃঙ্খলা এবং সম্পত্তি রক্ষার জন্য রাষ্ট্রের প্রতি জনগণের আনুগত্য থাকা প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন, প্রয়োজনের বেশি কারও কিছু রাখা ঠিক নয় বরং প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পত্তি জনগণের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া উচিত। সেন্ট অগাস্টিন ক্রীতদাসকেও এক প্রকার সম্পত্তি বলে অভিহিত করেছেন ।

৪. পার্থিব রাজ্যকে হেয় প্রতিপন্ন করা: সেন্ট অগাস্টিন তার ন্যায়তত্ত্বে পার্থিব রাজ্যকে অত্যন্ত নগণ্য হিসেবে গণ্য করেছেন এবং সর্বজন মহলে হেয় প্রতিপন্ন করেছেন। তিনি বলেন, অখ্রিস্টান কোনো রাষ্ট্রে ন্যায়নীতির মতো কোনো সামাজিক প্রীতি প্রবর্তন হতে পারে না।

কারণ ন্যায়-নীতি বর্জিত রাষ্ট্রকে দস্যু লুণ্ঠনকারীর সাথে তুলনা করা যায় । তাছাড়া অগাস্টিন তার ন্যায়তত্ত্বে রাষ্ট্রকে সর্বোচ্চ সংস্থা হিসেবে স্বীকৃতি না দিয়ে হেয়প্রতিপন্ন করেছেন।

৫. ধর্মের প্রতি গুরুত্বারোপ: অগাস্টিনের ন্যায়বিচার তত্ত্বের একটি বিশেষ দিক হলো খ্রিস্টধর্মের প্রতি গুরুত্বারোপ। তার মতে, খ্রিস্টধর্ম বিরোধী কোনো নীতি রাষ্ট্র গ্রহণ করলে তা হবে ন্যায়-নীতি বিরোধী। ন্যায়-নীতি সেই রাষ্ট্রে রূপায়িত হতে পারে যে রাষ্ট্রে খ্রিস্টান চার্চের নির্দেশের অনুসারী।

৬. চার্চের অবস্থান : অগাস্টিনের ন্যায়বিচার তত্ত্বে খ্রিস্টীয় চার্চ বিশিষ্ট স্থান দখল করে আছেন। তার মতে, পার্থিব জগতে মানুষ কেবল চার্চের মধ্যমেই স্বর্গে প্রবেশ করতে পারে এজন্য তিনি ন্যায়তত্ত্ব প্রতিষ্ঠায় খ্রিস্টীয় চার্চকে সর্বোচ্চ আসনে স্থান দিয়েছেন।

৭. নাগরিক দায়িত্ব ও কর্তব্য : নাগরিক দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন সেন্ট অগাস্টিনের ন্যায়বিচার তত্ত্বের আরেকটি বিশেষ দিক। তিনি বলেন, রাষ্ট্রে ন্যায়বিচার তখনই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলে ধরে নেয়া হয় যখন সে রাষ্ট্রের বিভিন্ন সদস্যগণ সততা এবং বিশ্ব সততার সঙ্গে তাদের জীবনের সর্বক্ষেত্রে নিজ দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করে এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবহার প্রতি যথাযথ আনুগত্য পোষণ করে ।

উপসংহার : উপর্যুক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় যে, অগাস্টিনের মতে, পার্থিব রাষ্ট্র দৈবরাষ্ট্রের অংশবিশেষ এবং এ রাষ্ট্র সম্পূর্ণরূপে স্রষ্টার অধীনে। সুতরাং পার্থিব রাষ্ট্র বা প্যাগান রাষ্ট্রে চূড়ান্ত ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। আর পার্থিব রাষ্ট্রের মুক্তি হবে তখনই যখন পার্থিব রাষ্ট্র আধ্যাত্মিক রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণাধীনে পরিচালিত হবে।

আসলে অগাস্টিনের মূল উদ্দেশ্য ছিল গির্জাকে সম্মান প্রদর্শনের মাধ্যমে সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা। সর্বোপরি তৎকালীন পাপাচার ক্লিষ্ট রাষ্ট্রে ন্যায়বিচারের মাধ্যমে শান্তি আনয়নের চেষ্টা করা।

০৬. দুই রাষ্ট্রতত্ত্ব বা বিধাতার রাষ্ট্র ও পার্থিব রাষ্ট্র . সম্পর্কে অগাস্টিনের চিন্তাধারা আলোচনা কর।
অথবা, সেন্ট অগাস্টিনের দুই রাষ্ট্রতত্ত্ব বা মতবাদ ব্যাখ্যা কর।

উত্তর : ভূমিকা : সেন্ট অগাস্টিন তার বিখ্যাত ”De Civitate Dei’ বা ”The City of God” গ্রন্থে রাষ্ট্র ও গির্জার পারস্পরিক সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে দুই রাষ্ট্রতত্ত্ব তথা বিধাতার রাষ্ট্র এবং পার্থিব রাষ্ট্রের ধারণার অবতারণা করেন। অগাস্টিনের মতে, রাষ্ট্র এবং সমাজে দুই শ্রেণির মানুষ বসবাস করে।

যার কারণে অগাস্টিন দুটি নগর বা রাষ্ট্রের কথা বলে। তিনি আরও বলেন, এই দুই রাষ্ট্রের মধ্যে একটির অবস্থান পৃথিবীতে এবং অন্যটির অবস্থান স্বর্গে। স্বর্গরাজ্যের মানুষ বিবেক ও যুক্তির দ্বারা পরিচালিত আর পার্থিব রাষ্ট্রের মানুষ পাপে নিমগ্ন

” দুই রাষ্ট্রতত্ত্ব বা বিধাতার রাষ্ট্র ও পার্থিব রাষ্ট্র সম্পর্কে অগাস্টিনের চিন্তাধারা : অগাস্টিনের মতে, কোনো সম্প্রদায়ের জনগণ যখন এক ও অভিন্ন চেতনার দ্বারা পরস্পর ঐক্যবদ্ধ হয় তখন একটি রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়।

আর রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক কাঠামো হলো গির্জা। অগাস্টিন তার ”The City of God” গ্রন্থে রাষ্ট্র ও গির্জার পারস্পরিক সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে তার দুই রাষ্ট্রতত্ত্ব প্রদান করে।

তার মতে, মানুষের দ্বৈতসত্তার পার্থক্য অনুসারে রাষ্ট্র দুই প্রকার। অর্থাৎ মানবজীবনের দুটি অংশের বিবেচনায় মানুষ একসঙ্গে দুটি রাষ্ট্রের নাগরিক। যথা : পার্থিব রাষ্ট্র (Earthly State) এবং বিধাতার রাষ্ট্র (Havenly State) ।

তার দুই রাষ্ট্রতত্ত্বের মৌলিক বিষয় হলো রাষ্ট্র ও সমাজে দেহ সর্বস্ব এবং আত্ম সর্বস্ব এই দুই শ্রেণির মানুষ বাস করে। যার ফলে মানুষের স্বার্থও দু’ধরনের হয়ে থাকে । যথা : ইহজাগতিক স্বার্থ এবং পরলৌকিক স্বার্থ।

দেহ সর্বস্ব এবং পরশ্রীকাতর মানুষের সমন্বয়ে পার্থিব রাষ্ট্র সৃষ্টি হয় এবং আত্মার আধিক্য সম্বলিত ব্যক্তিদের নিয়ে সৃষ্টি হয় স্বর্গীয় বা বিধাতার রাষ্ট্র। নিম্নে অগাস্টিনের দুই রাষ্ট্র তথা পার্থিব রাষ্ট্র ও বিধাতার রাষ্ট্র সম্পর্কে আলোকপাত করা হলো-

ক. পার্থিব রাষ্ট্র সম্পর্কিত ধারণা : সেন্ট অগাস্টিনের মতে, সৃষ্টির শুরুতে পার্থিব রাষ্ট্রের কোনো অস্তিত্ব ছিল না। কারণ পার্থিব রাষ্ট্রের উৎপত্তির উৎস হলো আদি মানব আদমের স্বর্গ হতে বিতাড়ন ।

স্বর্গ হতে আদমের বিতাড়নের ফলে যে পাপের সৃষ্টি হয় সেই পাপের ফলই হচ্ছে পার্থিব রাষ্ট্র । যতদিন পৃথিবীতে পাপ চলমান থাকবে ততদিন পর্যন্ত পার্থিব রাষ্ট্র টিকে থাকবে। এ রাষ্ট্র বর্ণ, গোত্র ও বিভিন্ন শ্রেণিভিত্তিক। তাছাড়া পার্থিব রাষ্ট্র জাতীয়তার আদলে সীমাবদ্ধ এবং বিভিন্ন খণ্ডে বিভক্ত।

সেন্ট অগাস্টিন আরও বলেন, পার্থিব রাষ্ট্র হলো আত্ম প্রেমের অভিব্যক্তি। এই রাষ্ট্রের প্রধান ভিত্তি হলো ক্রোধ, ব্যক্তি স্বার্থ এবং অহংকার। এ রাষ্ট্রের নাগরিকরা সবসময় নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত থাকে। অপরের জন্য প্রেম-প্রীতি ও ভালোবাসা এদের মধ্যে সচরাচর দেখা যায় না।

কারণ এরা স্বার্থপর এবং বিধাতার নাম উপেক্ষা করে চলে। অগাস্টিন বলেন, পার্থিব রাষ্ট্রের জনগণ নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকে। এদের মধ্যে সততা, নিষ্ঠা ও মানবতাবোধ লক্ষ করা যায় না। ফলে এরূপ রাষ্ট্রের লোকেরা প্রকৃত সুখ-শান্তি লাভ করতে পারে না ।

খ. স্বর্গরাজ্য বা বিধাতার রাষ্ট্র : অগাস্টিন বলেন, বিধাতার রাষ্ট্র বা স্বর্গরাজ্য মানব আত্মার প্রতিনিধিত্ব করে। এ রাষ্ট্রের মৌলিক ভিত্তি হলো এক ও অভিন্ন স্রষ্টার সন্তুষ্টি অর্জন স্বৰ্গীয় সুখ-শান্তি এবং মুক্তির কামনাই এ রাষ্ট্রের নাগরিকদের উৎসাহের মূল উৎস।

ভদ্রতা, নম্রতা এবং সদাচরণ এই রাষ্ট্রের নাগরিকদের অন্যতম চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। পবিত্রতা এবং সর্বমঙ্গলময় সুষম প্রকাশই এই রাষ্ট্রের মূল অভিব্যক্তি।

অগাস্টিন আরও বলেন, বিধাতার রাষ্ট্র জাতীয়তার সংক্ষিপ্ত সীমাবদ্ধতার দ্বারা আবদ্ধ নয়। স্বর্গের দেবদূতগণ এবং যেসব পুণ্যাত্মা অতীতে হারিয়ে গেছে তারাও এর সদস্য হওয়ার যোগ্যতা রাখে। তবে উভয়কে সমান বা একই না বলেও উভয়ের মধ্যে যে অভিন্ন যোগসূত্র রয়েছে তা অত্যন্ত স্পষ্ট ও স্বচ্ছ।

তিনি অত্যন্ত জোর দিয়ে বলেছেন, “মানবসমাজের অতি মূল্যবান যে দুটি বস্তু ন্যায়বিচার ও শান্তি তা শুধুমাত্র বিধাতার রাষ্ট্রেই বাস্তবায়ন করা সম্ভর অন্য কোথাও নয়।” ঈশ্বরের রাজত্ব সম্পর্কে সেন্ট অগাস্টিনের ধারণাটি নিম্নে বিশ্লেষণ করা হলো-

১. পবিত্র ও মঙ্গলময় : সেন্ট অগাস্টিনের এই রাজ্যে অপবিত্র ও অকল্যাণমূলক কোনো কাজের স্থান নেই। ঈশ্বরের এই রাজ্য সর্বাবস্থায় মানুষকে কল্যাণের দিকে আহ্বান করে এক কথায় ঈশ্বরের রাজ্য তথা বিধাতার রাষ্ট্র পবিত্র ও সকলের জন্য মঙ্গলময় ।

২. অভিশাপ থেকে: মুক্তি অগাস্টিনের মতে, পার্থিব রাষ্ট্র মানুষের পাপের ফল এবং বিধাতার অভিশাপ ছাড়া আর কিছুই নয়। তার মতে, পার্থিব রাজ্যের এ অভিশপ্ত জীবন থেকে মুক্তির জন্য সৃষ্টিকর্তার আশীর্বাদ প্রয়োজন। আর সৃষ্টিকর্তার এ আশীর্বাদ একমাত্র ঈশ্বরের রাজ্যেই পাওয়া সম্ভব বলে অগাস্টিন মনে করেন। কেননা এই রাজ্য আলোকময়, চিরভাস্বর, দুর্ভেদ্য এবং লোভ-লালসা ও অহংকারমুক্ত।

৩. ঈশ্বরের রাজ্যের প্রবেশদ্বার : অগাস্টিন বলেন, ঈশ্বরের রাজ্য ও গির্জার সদস্যবৃন্দ এক ও অভিন্ন । আর গির্জা দৈবরাষ্ট্রের অভিন্ন প্রকৃতির না হলেও তা ঈশ্বরের নিকটবর্তী সর্বাপেক্ষা বাস্তব প্রতিষ্ঠান । তার মতে, গির্জা শুধু ঈশ্বরের রাষ্ট্রের একটি অংশ নয়; বরং এটি ঈশ্বরের রাজ্যে প্রবেশের প্রধান দরজা স্বরূপ।

৪. ধর্মপ্রাণ ও আত্মসুখ বিসর্জনকারী : বিধাতার রাষ্ট্রের জনগণ ঈশ্বরের ওপর সবকিছু সমর্পণ করে ঈশ্বরের ধ্যানে মগ্ন থাকে এ রাষ্ট্রের নাগরিকরা অত্যন্ত ধর্মপ্রাণ এবং আত্মসুখ বিসর্জন দিয়ে ঈশ্বরের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে। ঈশ্বরের সান্নিধ্য লাভকে এ রাষ্ট্রের জনগণ চরম ও চূড়ান্ত সাফল্য বলে মনে করেন । বস্তুত এরাই বিবেকবোধ ও যুক্তির দ্বারা পরিচালিত ।

৫. বিধাতার রাষ্ট্রের সদস্য হওয়ার যোগ্যতা : অগাস্টিনের মতে, যেকোনো আদম সন্তান ঈশ্বরের রাষ্ট্রের সদস্য হওয়ার যোগ্যতা রাখে না। যেসব মানুষ বিধাতার করুণাপ্রাপ্ত শুধুমাত্র তারাই এ রাষ্ট্রের সদস্য হওয়ার যোগ্য।

আর বিধাতা সবসময় সকল লোককে করুণা প্রদান করেন না। অগাস্টিন মনে করেন, খ্রিস্টধর্মে যারা অটল বিশ্বাস স্থাপন করেছেন শুধুমাত্র তারাই ঈশ্বরের করুণা লাভের যোগ্য।

৬. অনাবিল শান্তি ও আধ্যাত্মিক মুক্তি : মূলত অনাবিল শান্তি ও আধ্যাত্মিক মুক্তিকে কেন্দ্র করে অগাস্টিনের বিধাতার রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত। তাই এ রাষ্ট্রের জনগণ সর্বাবস্থায় ন্যায়বিচার ও শান্তি কামনা করে। এরা ধর্মে বিশ্বাসী এবং একান্তভাবে ঈশ্বরের আশীর্বাদ প্রত্যাশী। তাই এরূপ রাষ্ট্রে অনাবিল শান্তি ও আধ্যাত্মিক মুক্তির সম্ভাবনা সর্বাধিক।

উপসংহার : উপর্যুক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় যে, সেন্ট অগাস্টিন তৎকালীন মধ্যযুগীয় বাস্তব অবস্থার প্রেক্ষিতে তার দুই রাষ্ট্রতত্ত্ব প্রণয়ন করেছিলেন।

তিনি শুধুমাত্র ধর্মীয় চেতনার ভিত্তিতে দুই রাষ্ট্রতত্ত্ব প্রণয়ন করেছিলেন এবং এই দুই রাষ্ট্রের মধ্যে তুলনা করে স্বর্গীয় তথা বিধাতার রাষ্ট্রকে বেশি প্রাধান্য দিয়েছেন।

কেননা, ঈশ্বরের রাষ্ট্রেই কেবল চিরস্থায়ী সুখ-শান্তি বিরাজমান। মূলত খ্রিস্টানধর্মের অনুশাসনে একটি সুন্দর ও সুশৃঙ্খল রাষ্ট্র গঠনের উদ্দেশ্যে তিনি এই তত্ত্ব প্রচার করেছেন।

০৭. সেন্ট অগাস্টিনের ‘দুই তরবারি তত্ত্ব’ সম্পর্কে আলোচনা কর।
অথবা, অগাস্টিনের দুই তরবারি তত্ত্বের ধারণা বিশ্লেষণ কর।

উত্তর : ভূমিকা : রাষ্ট্রচিন্তার ইতিহাসে মধ্যযুগকে অন্ধকারাচ্ছন্ন যুগ বলে অভিহিত করা হলেও সেন্ট অগাস্টিন তার উদ্ভাবিত বিভিন্ন তত্ত্বের মাধ্যমে এ অন্ধকারাচ্ছন্ন রাজনৈতিক অবস্থায় কিছুটা হলেও আশার আলো দেখানোর চেষ্টা করেছিলেন।

অগাস্টিন গ্রিক ও রোমান সভ্যতা এবং খ্রিস্টীয় সভ্যতার সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘ ‘De Civitate Dei’ তথা ‘The City of God’  রচনা করে মানুষের জন্য এক অভয়বাণী উচ্চারণ করেন। এ গ্রন্থের একটি উল্লেখযোগ্য তত্ত্ব হলো ‘দুই তরবারি তত্ত্ব’। অগাস্টিন তৎকালীন খ্রিস্টীয় সমাজের শান্তিশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এই তত্ত্ব প্রদান করেন ।

সেন্ট অগাস্টিনের ‘দুই তরবারি তত্ত্ব’ : মধ্যযুগের অধিকাংশ দার্শনিকই ধর্মীয় তথা খ্রিস্টধর্মের অনুসারী ছিলেন। সেন্ট অগাস্টিনও অনুরূপভাবে চরম খ্রিস্টধর্মপন্থি বা যাজক ছিলেন। তিনি তার তত্ত্বসমূহকে খ্রিস্টধর্মের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গির্জাকে সর্বোচ্চ স্থান প্রদানে সর্বদা সচেষ্ট ছিলেন।

তবে তিনি গির্জার কর্মকাণ্ডকে প্রাধান্য দিলেও রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বকে অস্বীকার করার চেষ্টা করেন নি । তিনি মূলত রাষ্ট্র ও গির্জার মাধ্যমে পারস্পরিক সাহায্য সহযোগিতার ভিত্তি গড়ে তোলার জোর প্রচেষ্টা চালান। তার এ নীতির ওপর ভিত্তি করে গির্জা ও রাষ্ট্র একে অপরের কাজে হস্তক্ষেপ বা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না করার ব্যাপারে যে ঘোষণা দেন তা ‘দুই তরবারি তত্ত্ব’ হিসেবে অভিহিত।

যদিও অগাস্টিন তার রাজনৈতিক তত্ত্বগুলোতে রাষ্ট্র ও গির্জাকে দুটি স্বতন্ত্র ও পৃথক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গণ্য করেছেন তথাপি খ্রিস্টীয় যাজকদের মতে, রাষ্ট্র ও গির্জা দুটি স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান নয়, বরং একটি ঐক্যবদ্ধ ব্যবস্থার দুটি দিক হলো গির্জা ও রাষ্ট্র গির্জা এবং এর পুরোহিত মানুষের আধ্যাত্মিক বা পারলৌকিক জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং মানুষের মুক্তির দিশারী হিসেবে কাজ করে।

পক্ষান্তরে, পার্থিব জীবনের নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্রের প্রতিনিধি হিসেবে রাজা বা সম্রাটগণ মানুষের জীবনের নিরাপত্তা এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করেন ।

অর্থাৎ রাষ্ট্র ও গির্জা দুটি স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান এবং তাদের কাজের ধরনও স্বতন্ত্র প্রকৃতির। দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনের ক্ষেত্রে তারা স্বাধীনভাবে কাজ করে থাকে । ক্ষমতার এ দ্বৈতনীতির ভিত্তিতেই সেন্ট অগাস্টিন পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষ দিকে ‘দুই তরবারি তত্ত্বের’ ধারণা প্রদান করেন।

এক্ষেত্রে অগাস্টিন খ্রিস্টীয় ধর্মযাজকদের মনোভাব কাজে লাগান। তাদের বিশ্বাসের সাথে সুর মিলিয়ে অগাস্টিন বলেন, পার্থিব ও আধ্যাত্মিক যাবতীয় ক্ষমতার উৎস হলো সৃষ্টিকর্তা। তিনি কর্তৃত্বের স্বরূপ হিসেবে একখানি তরবারি পোপকে এবং অন্যটি সম্রাটকে প্রদান করেছেন।

সম্রাট তার তরবারি বা ক্ষমতা দ্বারা মানুষের বাহ্যিক জীবনের ওপর নিয়ন্ত্রণারোপ করবে তথা প্রভুত্ব করবেন। পক্ষান্তরে পোপ তার তরবারি দ্বারা মানুষের আধ্যাত্মিক জীবন নিয়ন্ত্রণ করবে। পোপ প্রথম গেলাসিয়াস পঞ্চম শতকে সর্বপ্রথম এই তত্ত্বকে ব্যাখ্যা করেন বলে একে গেলাসিয়াস তত্ত্বও বলে অভিহিত করা হয়।

‘দুই তরবারি তত্ত্ব’ সম্পর্কে গেলাসিয়াস বলেন, ধর্মীয় ব্যাপারে শাসক যাজকের অধীন এবং এ ব্যাপারে শুধু তার শেখার আছে, শিক্ষা দেওয়ার কিছু নেই। আবার পার্থিব ব্যাপারে এমন সব নিয়মকানুন যা মেনে চলা যাজকদের জন্য একান্ত প্রয়োজন।

দুই তরবারি তত্ত্বে যাজক ও সম্রাটের ক্ষমতার মধ্যে পার্থক্যের কথা বলা হলেও বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে এর সুনির্দিষ্ট সীমারেখা নিরূপণ করা কঠিন। যার ফলে গির্জা ও রাষ্ট্রের মধ্যে সংঘর্ষ দেখা দেয় এবং তা বহুকাল ধরে স্থায়িত্ব লাভ করে।

এর ফলে সমাজে তথা রাষ্ট্রে এক অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এবং এ অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য অগাস্টিন দুই তরবারি তত্ত্বের অবতারণা করেন। এ তত্ত্বের মূলকথা হলো পার্থিব জগতের সবকিছুর প্রধান কর্তা বা প্রভু হলেন রাজা বা সম্রাট আর আধ্যাত্মিক জগতের নিয়ন্ত্রণকর্তা বা প্রভু হলেন গির্জা বা তার প্রতিনিধি পোপ।

উপসংহার : উপর্যুক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় যে, সেন্ট অগাস্টিন খ্রিস্টধর্ম বিশ্বাসী এবং চরম পোপপন্থি দার্শনিক ছিলেন। আধ্যাত্মিক ব্যাপারে গির্জা এবং পার্থিব ব্যাপারে রাষ্ট্র স্বায়ত্তশাসন করবে এবং একের ব্যাপারে অন্যের হস্তক্ষেপ মুক্ত রাখার জন্য তিনি এ নীতির প্রবর্তন করেন।

কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো কালক্রমে পোপ, গ্রেগরি ও অন্যদের মতবাদের দ্বারা এ তত্ত্বের মূলে আঘাত হানা হয়। তখন বলা হয় যে, আধ্যাত্মিক ও পার্থিব উভয় ক্ষেত্রেই সম্রাটের ক্ষমতা পোপের ক্ষমতার অধীন। আর এ প্রভাবেই তিনি পোপের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত করতে সচেষ্ট হয়।

উক্ত বিষয় সম্পর্কে কিছু জানার থাকলে কমেন্ট করতে পারেন।
আমাদের সাথে ইউটিউব চ্যানেলে যুক্ত হতে এখানে ক্লিক করুন এবং আমাদের সাথে ফেইজবুক পেইজে যুক্ত হতে এখানে ক্লিক করুন। গুরুত্বপূর্ণ আপডেট ও তথ্য পেতে আমাদের ওয়েবসাইটে ভিজিট করুন। ফ্রি পিডিএফ ফাইল এখান থেকে ডাউনলোড করে নিন। অনার্স রাজনৈতিক সেন্ট অগাস্টিন রচনামূলক প্রশ্নোত্তর PDF

Check Also

PDF অনার্স প্লেটোপাশ্চাত্যের রাষ্ট্রচিন্তা সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর

PDF অনার্স প্লেটো:পাশ্চাত্যের রাষ্ট্রচিন্তা সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর

PDF অনার্স প্লেটো:পাশ্চাত্যের রাষ্ট্রচিন্তা সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ও অনার্স প্লেটো:পাশ্চাত্যের রাষ্ট্রচিন্তা, পর্ব – ১ ( প্রাচীন …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *