অধ্যায় ৩:মৌলিক ধারণাসমূহ:(ফ্রি PDF) রচনামূলক প্রশ্নোত্তর

অধ্যায় ৩:মৌলিক ধারণাসমূহ:(ফ্রি PDF) রচনামূলক প্রশ্নোত্তর: ৩য় অধ্যায় এর অতিসংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর,সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর রচনামূলক প্রশ্নোত্তর, সাজেশন সম্পর্কে আজকে বিস্তারিত সকল কিছু জানতে পারবেন। সুতরাং সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি মনোযোগ দিয়ে পড়ুন। অনার্স ১ম বর্ষের যেকোন বিভাগের সাজেশন পেতে জাগোরিকের সাথে থাকুন।

অধ্যায় ৩:মৌলিক ধারণাসমূহ:(ফ্রি PDF) রচনামূলক প্রশ্নোত্তর

অনার্স প্রথম বর্ষ
বিষয়ঃ রাজনৈতিক তত্ত্ব পরিচিতি
অধ্যায় : মৌলিক ধারণাসমূহ
বিষয় কোডঃ ২১১৯০৯

বিভাগঃ রচনামূলক প্রশ্নোত্তর

৩.০৪. সার্বভৌমত্ব সম্পর্কে টমাস হবসের ধারণা আলোচনা কর।
অথবা, সার্বভৌমত্ব সম্পর্কে টমাস হবসের ধারণা বিশ্লেষণ কর।

উত্তরঃ ভূমিকা : রাষ্ট্রবিজ্ঞানে বা রাষ্ট্রদর্শনে সার্বভৌমত্ব একটি উল্লেখযোগ্য প্রত্যয়। এ ক্ষমতা রাষ্ট্রের নাকি জনগণের, তা নিয়ে যুগে যুগেই বিতর্ক ছিল। হবস তার সার্বভৌম তত্ত্বে রাজাকে অসীম, চূড়ান্ত ক্ষমতা অর্পণ করার চেষ্টা করেছেন। রাষ্ট্রদর্শনে হবসের এ তত্ত্বের প্রভাব সুদূরপ্রসারী। কেননা টমাস হবসের সার্বভৌমত্বের ধারণা থেকে অনেকে তাদের রাষ্ট্রদর্শন আলোচনা করেছেন।

সার্বভৌমত্ব সম্পর্কে টমাস হবসের ধারণা : সার্বভৌম ক্ষমতার সংজ্ঞা দিতে গিয়ে হবস বলেন, “সার্বভৌম ক্ষমতা হলো এমন এক ব্যক্তি বা ব্যক্তিমণ্ডলী যার কাছে জনগণ নিজেদের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তির মাধ্যমে তাদের যাবতীয় প্রাকৃতিক অধিকার সমর্পণ করে দিয়ে তার যাবতীয় কাজকে নিজেদের কাজ বলে স্বীকার করে নেয়।

এ ব্যক্তি বা ব্যক্তিমণ্ডলীর লক্ষ্য হলো জনগণ কর্তৃক অর্পিত ক্ষমতাকে তার নিজস্ব বিবেচনায় জনসাধারণের শান্তি ও নিরাপত্তা বিধানের লক্ষ্যে নিয়োজিত করা।” অর্থাৎ যার নিকট জনগণ তাদের যাবতীয় অধিকার হস্তান্তর করে এবং নিজেদের সম্পূর্ণরূপে সমর্থন করে, তাকে সার্বভৌম বলা হয়। জনগণ এ অধিকার অর্পণ করে শান্তিপূর্ণ জীবনযাপনের উদ্দেশ্যে।

টমাস হবসের সার্বভৌমত্ব তত্ত্বের বৈশিষ্ট্য : নিম্নে টমাস হবসের সার্বভৌমত্ব তত্ত্বের বৈশিষ্ট্যসমূহ আলোচনা করা হলো :

১. সার্বভৌম জবাবদিহি করে না : হবসের মতে, সার্বভৌম তার কাজের জন্য জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে রাজি নয়। সে জনগণের ঊর্ধ্বে। সে জনগণের নিকট দায়ী নয়। যদিও সে জনগণের কাছ থেকেই ক্ষমতা লাভ করে।

২. চুক্তি হবস তার সার্বভৌমত্ব তত্ত্বে চুক্তির কথা বলেছেন। এখানে জনগণ সবাই চুক্তি করে তাদের সব অধিকার শাসকের হাতে অর্পণ করে। শাসক তাদের স্বার্থে সে হস্তান্তরিত ক্ষমতা প্রয়োগ করবে।

৩. শাসক চুক্তিতে থাকে না : জনগণ নিজেদের মধ্যে চুক্তি করে তাদের ক্ষমতা শাসকের হাতে অর্পণ করে। কিন্তু শাসক কী ধরনের কাজ করবে তার কোনো চুক্তি করে না। শাসক নিজের বিবেচনা মতো ক্ষমতা ব্যবহার করবে। সে চুক্তির অন্তর্গত নয়।

৪. জনস্বার্থে ক্ষমতা ব্যবহার : হবস বলেছেন যে, সার্বভৌম জনগণের অর্পিত ক্ষমতা জনস্বার্থে ব্যবহার করবেন। তার মূল উদ্দেশ্য হবে জনগণের কল্যাণ সাধন। এজন্য সে নিজের বিবেচনা ব্যবহার করে কাজ করবেন।

৫. জনসম্মতি নয় বিবেকই প্রধান : হবস তার সার্বভৌমত্ব তত্ত্বে জনগণের সম্মতি নয় বিবেক বিবেচনাকেই আইন তৈরির ভিত্তি হিসেবে ধরেছেন। রাজা যা বিবেচনা করবেন তাই সিদ্ধান্ত নিবেন এবং তা জনগণের ইচ্ছা-অনিচ্ছা দ্বারা প্রভাবিত হবে।

৬. স্বৈরাচারী হওয়ার প্রবণতা : সার্বভৌম তত্ত্বে হবস সার্বভৌমকে স্বৈরাচারী হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন যে, সার্বভৌম তার কাজের জন্য জনগণের নিকট দায়ী থাকবে না। সে যাই করবে তাই জনগণকে মানতে হবে। তাই সার্বভৌম স্বৈরাচারী হওয়ার সুযোগ পায় ।

৭. সার্বভৌমে সব সিদ্ধান্তই বৈধ : হবস তার তত্ত্বে সার্বভৌম ক্ষমতার বিবেক বিবেচনাকে ধ্রুবকের মতো সঠিক ধরে নিয়েছেন। তার মতে সার্বভৌম অবশ্যই সিদ্ধান্তকে বৈধতার মানদণ্ডে না মেপে বৈধ ধরে নেওয়া হয়।

৮. নিয়ন্ত্রণহীন : হবস এর সার্বভৌম শক্তি কোনো কিছু দ্বারা নিয়ন্ত্রিত নয়। সামাজিক প্রথা, মূল্যবোধ, নৈতিকতা ইত্যাদি কোনো কিছুই সার্বভৌম ক্ষমতাকে প্রভাবিত করতে পারে না।

৯. সার্বভৌমের জন্য কোনো আইন নেই : হবসের মতে, সার্বভৌম এর কার্যাবলি কোনো আইন দ্বারা বিবেচনা করা যাবে না। সে আইনের ঊর্ধ্বে। সার্বভৌম প্রাকৃতিক আইন না মানলেও কিছু বলা যাবে না। অর্থাৎ আইনের মাপকাঠিতে তার কার্যাবলি মাপার দরকার নেই । তার সবকিছুই বৈধ ।

১০. জনগণের স্বাধীনতা নেই : হবস এর মতে, জনগণ তাদের সব অধিকার, সার্বভৌম ক্ষমতা, স্বাধীনতা চুক্তির মাধ্যমে রাজার নিকট অর্পণ করে । রাজা যা বলে তাদেরকে তাই মেনে চলতে হয় । তাই জনগণ নিজেরা কোনো সিদ্ধান্ত দিতে পারে না বা ভোট প্রদান করতে পারে না । অর্থাৎ তাদের কোনো স্বাধীনতা নেই ।

১১. রাজাকে উচ্ছেদ করা যাবে না : হ্রস বলেন, সার্বভৌম তার বিবেচনাপ্রসূত ক্ষমতা ব্যবহার করেন। সে যা করে তার সবই স্বচ্ছ। এজন্য জনগণের নিকট সে জবাবদিহি করে না । রাজা ভুল করলেও জনগণ কিছু বলতে পারে না কারণ তারা তাদের সব অধিকার অর্পণ করেছে। তাই রাজাকে উচ্ছেদ করা যায় না।

১২. স্বার্থপর সার্বভৌম : হবস বলেন, সার্বভৌম সরকার যেকোনো আইন তৈরি করতে পারে। তাই সে অবশ্যই স্বার্থপরের মতো নিজের স্বার্থে আইন তৈরি করবে।

সমালোচনা : বিভিন্ন দিক থেকে হবসের তত্ত্বকে সমালোচনা করা যায়। নিম্নে কয়েকটি দেওয়া হলো—

১. অত্যাচারী শাসক : শাসক কোনো চুক্তির অংশ নয়। সে নিজের বিবেক মতো যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে। তাই সার্বভৌম শাসক এক সময় অত্যাচারী হয়ে ওঠে।

২. অগণতান্ত্রিক : হবসের সার্বভৌম শক্তি অগণতান্ত্রিক। নিজের ইচ্ছামতো জনগণের সম্মতি না নিয়ে যেকোনো আইন প্রণয়ন বা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে । তাই সে অগণতান্ত্রিক রূপ ধারণ করে।

৩. চুক্তির অবাস্তবতা : হবস এর মতে, “জনগণ সবাই মিলে চুক্তি করে একজনের নিকট তাদের ক্ষমতা অর্পণ করে।” তিনিই আবার বলেছেন যে, জনগণ উশৃঙ্খল, স্বার্থপর ইত্যাদি। তাই বাস্তব অর্থে তাদের দ্বারা ঐকমত্যের ভিত্তিতে কাউকে ক্ষমতা হস্তান্তর অসম্ভব ।

উপসংহার : উপর্যুক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় যে, হবস সার্বভৌমত্ব সম্পর্কে যে ধারণা প্রদান করেন তার মূলকথা হলো রাজতন্ত্রকে সর্বশক্তিমান ও দৃঢ় করা। তার মতানুসারে শাসক বা রাজার ইচ্ছাই হলো চূড়ান্ত ক্ষমতা।

মূলত হবস এর সার্বভৌমত্ব তত্ত্বকে সার্বভৌমত্বের একত্ববাদ বলা যায়। পরবর্তীতে হবস দ্বারা প্রভাবিত হয়ে জন অস্টিন আইনগত সার্বভৌমত্ব তত্ত্বের ধারণা প্রদান করেন। হবসের তত্ত্ব সমালোচিত হলেও তা রাষ্ট্রবিজ্ঞানকে একধাপ এগিয়ে নিয়েছে ।

৩.০৫. আইনের সংজ্ঞা দাও। আইনের উৎসসমূহ কী কী?
অথবা, আইন বলতে কী বুঝ? আইনের উৎসসমূহ আলোচনা কর।

উত্তরঃ ভূমিকা : নিয়ম নীতিবিহীন সমাজ বিশৃঙ্খলায় পরিপূর্ণ থাকে । মানবচরিত্র সাধারণতই বাধ্য না হলে ভালোভাবে আইন মেনে চলতে চায় না। তাদেরকে বাধ্যতামূলকভাবে নিয়মকানুনের ভিতরে রাখতে হয়।

সমাজের বিশৃঙ্খলা দূর করা, মানুষের জীবনের নিরাপত্তা বিধান করা, অধিকার রক্ষা করার জন্য আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগ অতি গুরুত্বপূর্ণ । আইন সমাজকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করে । নানাবিধ উৎসের ওপর ভিত্তি করে আইন তৈরি ও প্রণয়ন করা হয়।

শব্দগত অর্থে আইন : আইন হলো ফার্সি ভাষার একটি শব্দ যার ইংরেজি প্রতিশব্দ হলো ‘Law এই ‘Law শব্দটি এসেছে Tutonic ‘ল্যাগ’ (Lag) থেকে। ‘Lag’ অর্থ হলো স্থির, অপরিবর্তনীয় ও সমভাবে প্রযোজ্য। শব্দগত দিক থেকে আইন হলো এমন কিছু নিয়ম যা সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য ।

আইন : দেশের শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষা করা, জনগণের অধিকার রক্ষা করা রাষ্ট্রের কাজ। রাষ্ট্র এ কাজ সম্পাদনের জন্য কতকগুলো নিয়মকানুন, বিধিনিষেধ প্রণয়ন করে। সব নিয়মকানুন, বিধিবিধান ভঙ্গ করলে শাস্তি পেতে হয় তাকেই আইন বলা হয় ।

প্রামাণ্য সংজ্ঞাঃ টমাস হবস (Thomas Hobbes) বলেন, “প্রজাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে সার্বভৌম ক্ষমতাসম্পন্ন রাষ্ট্রীয় নেতাদের আদেশই হলো আইন ।”

বার্কার (Barker) বলেন, “কেবল রাষ্ট্র কর্তৃক স্বীকৃত, ঘোষিত ও প্রযুক্ত হলে আইনকে আদর্শ আইন বলা যাবে না। আইনের মধ্যে বৈধতা ও নৈতিক মূল্যবোধ অবশ্যই থাকতে হবে।”

অধ্যাপক হল্যান্ড (Prof. Holland) বলেন, “আইন হলো সেসব নিয়মকানুন যা মানুষের বাহ্যিক আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করে ও সার্বভৌম রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ দ্বারা বলবৎ করা হয়।”

এরিস্টটল (Aristotle) বলেন, “আইন হলো পক্ষাপাতহীন যুক্তি।” জন অস্টিন (John Austin) বলেন, “আইন হলো অধস্তনের প্রতি ঊর্ধ্বতন রাজনৈতিক কর্তৃত্বের আদেশ।” অধ্যাপক গেটেল (Prof. Gettell) বলেন, “রাষ্ট্র যেসব নিয়মকানুন সৃষ্টি করে, স্বীকার করে এবং বলবৎ করে তাই কেবল আইন বলে পরিগণিত হয়।”

আইনের উৎসসমূহ : সার্বভৌম কর্তৃপক্ষ আইন প্রণয়ন করে। এছাড়াও আইনের আরও বিভিন্ন উৎস রয়েছে। আইন সৃষ্টি হওয়ার পিছনে অনেক উপাদান কাজ করে। আইনের উৎস সম্পর্কে হল্যান্ড বলেন, “আইনের উৎস হলো প্রথা, ধর্ম, বিচারের রায়, বিজ্ঞানসম্মত আলোচনা, ন্যায়বিচার ও আইনসভা।” নিম্নে হল্যান্ডের আইনের উৎসসমূহ আলোচনা করা হলো—

১. প্রথা : আইন প্রথাভিত্তিক হয়ে থাকে। প্রথা হচ্ছে এমন সব নিয়মাবলি বা আচরণ যা কোনো এলাকার যুগ যুগ ধরে পালিত হয়ে আসে। পূর্বপুরুষ কর্তৃক পালিত এসব প্রথা সময়ের বিবর্তনে সবার কাছে বৈধ হয়ে ওঠে।

এগুলো ভঙ্গ করলে সমাজের কাছে ঘূর্ণিত হতে হয় এমনকি শাস্তিও হয়ে থাকে । তাই প্রথা আইনের মতোই মর্যাদা পায়। কোনো দেশের সরকার যখন আইন প্রণয়ন করে তখন সে প্রথার বাইরে যেতে পারে না। তাই প্রথা হলো আইনের প্রাচীনতম উৎস।

২. ধর্ম : কোনো দেশের মানুষ তাদের ধর্মীয় বিধিবিধানের বাইরে সাধারণত যায় না। ধর্মীয় আইন মানুষের কাছে আবেগের বিষয়। ধর্মের নিয়মকানুন খুব বিশ্বাসের সাথে মানুষ মেনে চলে। সে ধর্ম আইনের উৎস হিসেবে কাজ করে। বিশ্বের অনেক দেশই ধর্মীয় আইন দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে। যেমন— ইরান, ভ্যাটিকান সিটি ইত্যাদি। মধ্যযুগে আইনের ওপর ধর্মের প্রভাব ছিল সবচেয়ে বেশি।

৩. ন্যায়বিচার : আইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হচ্ছে ন্যায়বোধ বা ন্যায়বিচার। অনেক সময় সমাজে এমন কোনো বিবাদ বা ঘটনার সৃষ্টি হয় যেগুলোর সমাধান রাষ্ট্রীয় আইন দ্বারা করা সম্ভব হয় না। তখন বিচারক তার ন্যায়বোধ, বিবেক-বিবেচনা ব্যবহার করে মামলার রায় দেন। পরবর্তীতে তা আইন হিসেবে প্রচলিত হয়। তাই ন্যায়বোধকে হল্যান্ড আইনের উৎস বলে উল্লেখ করেছেন।

৪. বৈজ্ঞানিক আলোচনা : দেশের বিখ্যাত আইনবিদরা সংকটকালীন মুহূর্তে একত্রে বসে আলাপ আলোচনা করে। = তাদের বিজ্ঞানসম্মত সে আলোচনা দ্বারা অনেক সময় আইন তৈরি হয়। এসব আইনজ্ঞরা বর্তমান, অতীত ঘটনা, বিশ্ব ইতিহাস প্রভৃতি পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। যেমন— ইংল্যান্ডের বিখ্যাত আইনবিদ ব্লাকস্টোন, কোক, অস্টিনের আইন ব্রিটেনের আইনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ দখল করে আছে।

৫. বিচারের রায় : সমাজে অনেক সময় এমন জটিল ঘটনার উদ্ভব হয় যেগুলোর মীমাংসা প্রচলিত আইন বা রাষ্ট্রীয় আইন দ্বারা করা সম্ভব হয় না। এখন বিচার-বুদ্ধির আশ্রয় নিয়ে বিচারক রায় দেন বিচারের সে রায় পরবর্তীতে রাষ্ট্রীয় আইনের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। অধ্যাপক গেটেল বলেন, “আইন প্রণেতা হিসেবে রাষ্ট্রের উদ্ভব হয়নি, রাষ্ট্রের উদ্ভব হয়েছিল প্রথার ব্যাখ্যাকর্তা ও প্রয়োগকারী হিসেবে।”

৬. আইনসভা : আইনসভা হচ্ছে আইনের সবচেয়ে বৃহৎ উৎস। আধুনিক রাজনীতিতে আইনসভায় বেশির ভাগ আইন প্রণয়ন করেন। সরকারের তিনটি বিভাগ থাকে। যাদের মধ্যে আইন বিভাগের দায়িত্বই হলো আইন প্রণয়ন করা। আইনসভাতে কোনো আইনের খসড়া উত্থাপন করা হয়। তা নিয়ে আলোচনা বা বিতর্ক হয়। সংখ্যাগরিষ্ঠের সমর্থনে তা আইন বলে বিবেচিত হয়।

৭. জনমত : জনমতহীন আইন সমাজে স্থায়ী হয় না। কোনো বিষয়ে সবার মত থাকলে তা সমাজে আইনের মতো পালিত হয়। আইনসভাও আইন প্রণয়নকালে জনমতের প্রতি খেয়াল রাখে। ওপেনহিম বলেন, “জনমতই হলো আইনের প্রধান উৎস।”

৮. সামাজিক বিধি : প্রত্যেক সমাজে নির্দিষ্ট নিয়মকানুন থাকে । যেমন— গারো সমাজে এক নিয়ম, হিন্দু সমাজে এক নিয়ম, খ্রিস্টান সমাজে এক নিয়ম ইত্যাদি। এসব সামাজিক বিধি আইনের উৎস হিসেবে কাজ করে।

৯. সামরিক আইন : কোনো দেশে সামরিক শাসন জারি হলে সামরিক শাসনামলকে বৈধ করার জন্য ঐ আমলে সব আদেশকে আইনের অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

১০. শাসন বিভাগের আইন বা হস্তান্তরিত আইন আধুনিককালে আইন বিভাগের কর্মপরিধি অনেক ব্যাপক হয়েছে। তাই আইন বিভাগ কখনও শাসন বিভাগের হাতে কিছু আইন প্রণয়নের ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। শাসন বিভাগের তৈরি আইনকে বলা হয় হস্তান্তরিত আইন ।

১১. বৈদেশিক চুক্তি বিভিন্ন দেশের সাথে একটি দেশ নির্দিষ্ট বিষয়ে চুক্তি করে থাকে। এগুলো ব্যবসা ক্ষেত্রে, সৈন্যবাহিনীর ক্ষেত্রে, সীমান্ত বিরোধ নিয়ে হতে পারে। সেসব চুক্তির ধারা আইনের মতোই মেনে চলতে হয়। তাই বৈদেশিক চুক্তিকে আইনের উৎস বলা যায়।

১২. সংবিধানের আইন : কোনো দেশের সংবিধান হলো আইনের প্রধান উৎস। সংবিধানের অনেক ধারা থাকে যেগুলো রাষ্ট্রের সকলের দ্বারা মেনে চলা হয়। সংবিধানের বাইরে যাওয়া যায় না। তাই সংবিধান হলো আইনের উৎস।

১৩. আন্তর্জাতিক আইন : আন্তর্জাতিক আইনকে বর্তমানে আইন হিসেবে সবাই মেনে চলে। কোনো নাগরিক বিদেশে গেলে ও কোনো দেশ বাইরের দেশের সাথে চুক্তি করলে বা সম্পর্ক গড়ে তুললে আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলতে হয়।

উপসংহার : উপর্যুক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় যে, আইনের বিভিন্ন উৎস রয়েছে। এসব উৎসের মধ্যে সাংবিধানিক আইনই উল্লেখযোগ্য। আইনসভাই হলো আইন তৈরির প্রধান উৎস। তবে আইন কখন, কীভাবে, কোন উৎস থেকে এসেছে তা সঠিকভাবে বলা যায় না। কিন্তু আইনের উৎস হিসেবে উপর্যুক্ত বিষয়গুলোকেই সর্বসম্মতভাবে স্বীকার করা হয় ।

৩.০৬. আইন কাকে বলে? মানুষ কেন আইন মেনে চলে?
অথবা, আইন কী? মানুষ আইন মেনে চলতে বাধ্য হয় কেন?

উত্তরঃ ভূমিকা : নিয়ম নীতিবিহীন সমাজ বিশৃঙ্খলায় পরিপূর্ণ থাকে । মানবচরিত্র সাধারণত বাধ্য না হলে ভালোভাবে আইন মেনে চলতে চায় না। তাদেরকে বাধ্যতামূলকভাবে নিয়মকানুনের ভিতরে রাখতে হয়। সমাজের বিশৃঙ্খলা দূর করা, মানুষের জীবনের নিরাপত্তা বিধান করা এবং অধিকার রক্ষা করার জন্য আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগ অতি গুরুত্বপূর্ণ । আইন সমাজকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করে ।

শব্দগত অর্থে আইন : আইন হলো ফার্সি ভাষার একটি শব্দ যার ইংরেজি প্রতিশব্দ হলো ‘Law। এই ‘Law শব্দটি এসেছে Tutonic শব্দ ‘খধম’ থেকে। ‘Lag’ অর্থ হলো স্থির, অপরিবর্তনীয় ও সমভাবে প্রযোজ্য। শব্দগত দিক থেকে আইন হলো এমন সব নিয়ম যা সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য ।

আইন : দেশের শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষা করা ও জনগণের অধিকার রক্ষা করা রাষ্ট্রের কাজ। রাষ্ট্র এ কাজ সম্পাদনের জন্য যেসর নিয়মকানুন, বিধিনিষেধ প্রণয়ন করে এবং সেসব নিয়মকানুন, বিধিবিধান ভঙ্গ করলে শাস্তি পেতে হয় তাকেই আইন বলা হয়

প্রামাণ্য সংজ্ঞা : টমাস হবস (Thomas Hobbes) বলেন, “প্রজাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে সার্বভৌম ক্ষমতাসম্পন্ন রাষ্ট্রীয় নেতাদের আদেশই হলো আইন।”

বার্কার (Barker)বলেন, “কেবল রাষ্ট্র কর্তৃক স্বীকৃত, ঘোষিত ও প্রযুক্ত হলে আইনকে আদর্শ আইন বলা যাবে না। আইনের মধ্যে বৈধতা ও নৈতিক মূল্যবোধ অবশ্যই থাকতে হবে।”

অধ্যাপক হল্যান্ড (Prof. Holland) বলেন, “আইন হলো সেসব নিয়মকানুন যা মানুষের বাহ্যিক আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করে ও সার্বভৌম রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ দ্বারা বলবৎ করা হয়।”

এরিস্টটল (Aristotle) বলেন, “আইন হলো পক্ষপাতহীন যুক্তি।” জন অস্টিন (John Austin)) বলেন, “আইন হলো অধস্তনের প্রতি ঊর্ধ্বতন রাজনৈতিক কর্তৃত্বের আদেশ।”

অধ্যাপক গেটেল (Prof. Gettell) বলেন, “রাষ্ট্র যেসব নিয়মকানুন সৃষ্টি করে, স্বীকার করে এবং বলবৎ করে তাই কেবল আইন বলে পরিগণিত হয়।” আইনের সুন্দর ও গ্রহণযোগ্য সংজ্ঞা দিয়েছেন আমেরিকার সাবেক রাষ্ট্রপতি উড্রো উইলসন (Woodrow Wilson ) ।

তার মতে, “আইন হলো মানুষের প্রতিষ্ঠিত চিন্তাধারা ও অভ্যাসের সে অংশ যা সাধারণ নিয়মের আকারে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি লাভ করে এবং যার পিছনে সরকারের কর্তৃত্ব ও ক্ষমতার সমর্থন রয়েছে।”

মানুষ যে কারণে আইন মান্য করে : সাধারণত মানুষ বিভিন্ন কারণে আইন মেনে চলে। অনেকের মতে, আইন ভঙ্গ করলে শাস্তি পেতে হয়। তাই শাস্তির ভয়ে মানুষ আইন মেনে চলে । আবার অনেকে মনে করেন যে, আইনের প্রয়োজনীয়তাবোধ করে বলেই মানুষ আইনকে মেনে চলে ।

মানুষ যে কারণে আইন মান্য করে তা নিম্নে বর্ণনা করা হলো— ১. উদাসীনতা : দেশের অনেক জনগণ যারা রাজনৈতিকভাবে উদাসীন থাকে, দেশের সরকার কী করছে তা তাদের চিন্তার বিষয় না। তারা নিজেদেরকে নিয়ে সর্বদা ব্যস্ত থাকে। যেহেতু তারা রাজনৈতিকভাবে সচেতন নয়, তাই কোনো দ্বিমত পোষণ না করেই তারা আইন মেনে নেয় ।

২. সহানুভূতি : কোনো দেশের সরকার জনগণের কল্যাণের জন্যই আইন তৈরি করে। আইন তৈরির মাধ্যমে তারা জনগণের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে। তাই জনগণ আইন মেনে চলে ।

৩. শাস্তির ভয় : আইন হলো সার্বভৌমের দ্বারা প্রণীত এমন সব নিয়মাবলি যা ভঙ্গ করা হলে মানুষকে রাষ্ট্র শাস্তি প্রদান করে থাকে । আইন ভঙ্গকারীর শাস্তির জন্য দেশে আদালত, জেল ও বিচার বিভাগ রয়েছে। তাই শাস্তির বা বিচারের ভয় থেকে মানুষ আইন মেনে চলে ।

৪. প্রয়োজনীয়তা বোধ : মানুষ সমাজজীবনে আইনের প্রয়োজনীয়তাবোধ অনুভব করে। তারা বুঝতে পারে যে, আইন না মানলে মানুষের অধিকার, স্বাধীনতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। অর্থাৎ আইনের উপযোগিতা রয়েছে। তাই মানুষ আইন মেনে চলে ।

৫. অন্যরা মেনে চলে তাই : সময়ের বিবর্তনে মানুষ আইন মেনে আসছে। সমাজের বেশির ভাগ মানুষ আইনকে মেনে চলে, শ্রদ্ধা করে। আইন মেনে চলা একটি সামাজিক রীতি বা প্রথা। তাই মানুষ আইন মেনে চলে ।

৬. অধিকার রক্ষা : সমাজে আইনানুগ ব্যবস্থা না থাকলে মানুষ মানুষের অধিকার লঙ্ঘন করে থাকে। আইন মানুষের অধিকারকে সংরক্ষণ করে। তাই অধিকার রক্ষার লক্ষ্যে মানুষ আইন মেনে চলে ।

৭. স্বাধীনতার রক্ষাকবচ : স্বাধীনতার যে রক্ষাকবচগুলো রয়েছে তার মধ্যে আইন অন্যতম। আইন বজায় থাকলে কোনো ব্যক্তি অন্যের স্বাধীনতা অর্জনে বাধা দিতে পারে না। কারণ অন্যের স্বাধীনতায় বাধা দেওয়া বেআইনি । তাই মানুষ আইন মেনে চলে ।

৮. সমভাবে প্রযোজ্য : ‘Law’ শব্দটির উৎপত্তি ‘Lag’ থেকে যার অর্থ হলো সমভাবে প্রযোজ্য। আইন কারো জন্য বাধ্যতামূলক আবার কারো জন্য শিথিল এমন নয়। সবার জন্য আইন প্রযোজ্য। সবাইকে আইন মেনে চলতে হয়, না মানলে শাস্তি দেওয়া হয় । তাই মানুষ আইনকে শ্রদ্ধা করে ও মেনে চলে ।

৯. সমাজকে সুন্দর করে আইনের যথার্থ প্রয়োগ একটি সমাজকে সুন্দর ও সুশৃঙ্খল করে তোলে। যে সমাজে সবাই আইন মেনে চলে, সে সমাজে কোনো অপরাধ, ঝগড়া ও দ্বন্দ্ব থাকে না। তাই সমাজে শান্তিতে বসবাসের ইচ্ছায় মানুষ আইন মেনে চলে।

১০. সামাজিক হেয়প্রতিপন্নতার ভয়ে : যে ব্যক্তি আইনকানুন মেনে চলে না, সমাজ তাকে হেয় চোখে দেখে ও ঘৃণা করে। সামাজিকভাবে ঘৃণিত হওয়া অনেক কষ্টের। তাই মানুষ সামাজিক হেয়প্রতিপন্নতার ভয়ের আইন মেনে চলে

১১. উত্তম ব্যক্তি হওয়ার জন্য : যে ব্যক্তি আইনকে মেনে চলে, তাকে সবাই সম্মান করে। আইন মান্যকারী ব্যক্তিকে সবাই ভালোবাসে। সে সমাজে উত্তম বলে বিবেচিত হয়। তাই নিজেকে উত্তমরূপে গড়ে তোলার জন্য আইন মেনে চলতে হয়।

১২. ধর্মীয় ও নৈতিক কারণে : কোনো সমাজের আইন সে সমাজের ধর্মীয় নিয়মাবলি, নৈতিক দিক দ্বারা পরীক্ষিত। আইন মানা মানে ধর্ম ও নৈতিকতার প্রতি সম্মান দেখানো। যেসব মানুষ ধর্মকে সম্মান করে, নৈতিকতাকে শ্রদ্ধা করে, সে আইন মেনে চলে।

১৩. বিবেকের তাড়নায় : বিবেকবান মানুষ আইন মেনে চলে। যারা বিবেককে সুষ্ঠুভাবে কাজে লাগায় তারা কোনো অন্যায় করে না বা মেনে নেয়। তারা জনগণের স্বার্থের কথা ভাবে। যেসব ব্যক্তি বিবেকবান তারা বুঝে যে, আইন মানা উচিত। তাই বিবেকবান মানুষ আইন মেনে চলে ।

১৪. সুন্দর জীবন গড়তে : একজন মানুষ যদি আইন মেনে চলে তাহলে সে কোনো ঝামেলায় পড়ে না। আইন মানতে গিয়ে সে কোনো অপরাধ করে না। তাকে বিচারের সম্মুখীন হতে হয় না। তাই সুখী সুন্দর জীবন গড়ার আশায় মানুষ আইন মেনে চলে।

১৫. সুসম্পর্ক বজায় রাখতে : সবাই যদি আইন মেনে চলে তাহলে কারো প্রতি কেউ কোনো অত্যাচার করে না। কারো অধিকার ও স্বাধীনতায় কেউ হস্তক্ষেপ করে না। এতে করে সমাজে সুসম্পর্ক বজায় থাকে। তাই মানুষে মানুষে সুসম্পর্ক বজায় রাখার জন্য আইন মেনে চলা হয় ।

উপসংহার : উপর্যুক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় যে, আইন হলো একটি লিখিত বিধিবিধান যা সবার জন্য সমভাবে প্রযোজ্য। এ ব্যবস্থার ফলে সমাজে সাম্য প্রতিষ্ঠিত হয়, যা নাগরিক জীবনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। মূলত আইনের শাসন কোনো সমাজকে সুখী ও সমৃদ্ধিশালী করে তোলে। আইন মেনে চললে অনেক উপকারিতা পাওয়া যায়। তাই মানুষ আইন মেনে চলে ।

উক্ত বিষয় সম্পর্কে কিছু জানার থাকলে কমেন্ট করতে পারেন।
আমাদের সাথে ইউটিউব চ্যানেলে যুক্ত হতে এখানে ক্লিক করুন এবং আমাদের সাথে ফেইজবুক পেইজে যুক্ত হতে এখানে ক্লিক করুন
গুরুত্বপূর্ণ আপডেট ও তথ্য পেতে আমাদের ওয়েবসাইটে ভিজিট করুন। ফ্রি পিডিএফ ফাইল এখান থেকে ডাউনলোড করে নিন। অধ্যায় ৩:মৌলিক ধারণাসমূহ:(ফ্রি PDF) রচনামূলক প্রশ্নোত্তর

Check Also

PDF অনার্স প্লেটোপাশ্চাত্যের রাষ্ট্রচিন্তা সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর

PDF অনার্স প্লেটো:পাশ্চাত্যের রাষ্ট্রচিন্তা সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর

PDF অনার্স প্লেটো:পাশ্চাত্যের রাষ্ট্রচিন্তা সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ও অনার্স প্লেটো:পাশ্চাত্যের রাষ্ট্রচিন্তা, পর্ব – ১ ( প্রাচীন …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *